ফুটবল বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়ে ইতিহাস গড়েছে কুরাসাও। ছোট্ট ক্যারিবীয় দ্বীপদেশটির মানুষের আনন্দ যেন এখনও থামেনি। দলের একমাত্র কুরাসাও-জন্ম ফুটবলার তাহিথ চং বলেছেন, বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের পর থেকে যেন পুরো দ্বীপের মানুষ ঘুমানোই ভুলে গেছে।
আগামী ১৪ জুন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে জার্মানির মুখোমুখি হবে কুরাসাও। সেই ম্যাচ শুধু ফুটবল নয়, দেশটির জন্যও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে উঠতে যাচ্ছে। ২৬ বছর বয়সী উইঙ্গার তাহিথ চংয়ের জন্য এই উপলক্ষ আরও বিশেষ। কারণ জাতীয় দলের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তার জন্ম কুরাসাওতেই।
শেকড়ের টানে কুরাসাও
শৈশবের বড় একটি সময় কুরাসাওয়ে কাটিয়েছেন চং। পরে ফুটবল ক্যারিয়ার গড়তে নেদারল্যান্ডসে চলে যান। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ডাচ দলের হয়ে খেললেও সিনিয়র পর্যায়ে নিজের মাতৃভূমি কুরাসাওকেই বেছে নেন।
চংয়ের ভাষায়, কুরাসাও সবসময় তার কাছে নিজের ঘরের মতো মনে হয়েছে। ছুটি পেলেই তিনি দেশে ফিরে যান। তাই জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ এলে সিদ্ধান্ত নিতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি।
আবেগঘন পারিবারিক স্মৃতি
জাতীয় দলের হয়ে কুরাসাওয়ে প্রথম ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা চংয়ের কাছে বিশেষ আবেগের। যে স্কুলে ছোটবেলায় পড়েছেন, জাতীয় দলের ক্যাম্প ছিল তার ঠিক সামনেই। সেই ম্যাচে পরিবারের অনেক সদস্য প্রথমবার মাঠে বসে তাকে খেলতে দেখেন।
সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল তার ৯৬ বছর বয়সী দাদির উপস্থিতি। দীর্ঘদিন টেলিভিশনে নাতির খেলা দেখলেও বয়সের কারণে মাঠে আসতে পারেননি। সেই সুযোগটি পেয়েছিলেন কুরাসাওয়ের ম্যাচে। ম্যাচের পর চং দাদির সঙ্গে দেখা করেন। মাত্র দুই মাস পর তার মৃত্যু হয়। তাই সেই দিনটি এখন তার কাছে আরও মূল্যবান স্মৃতি হয়ে আছে।

বিশ্বকাপ দেখেই ফুটবলের প্রেমে
চং জানান, ২০০৬ সালের বিশ্বকাপই তাকে ফুটবলের প্রেমে ফেলেছিল। ইতালি ও ফ্রান্সের ফাইনাল ম্যাচ দেখে তিনি মুগ্ধ হন। তখন তিনি ফ্রান্সকে সমর্থন করছিলেন এবং দলের পরাজয়ে কেঁদেও ফেলেছিলেন। সেই ম্যাচের পরই বাবাকে জানান যে তিনি ফুটবল খেলতে চান।
দুই দশক পর সেই বিশ্বকাপের মঞ্চেই নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাওয়াকে তিনি স্বপ্নপূরণ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্বকে কুরাসাওকে চেনানোর সুযোগ
চং বিশ্বাস করেন, বিশ্বকাপ কুরাসাওকে বিশ্বের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরার সুযোগ এনে দিয়েছে। অনেক মানুষ এখনও দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি কিংবা পরিচয় সম্পর্কে জানেন না। বিশ্বকাপের মাধ্যমে তারা শুধু ফুটবলই নয়, নিজেদের দেশ ও জনগণের গল্পও তুলে ধরতে চান।
তিনি বলেন, জাতীয় দলের ভেতরে পারিবারিক বন্ধনের মতো পরিবেশ রয়েছে। এখানে ব্যক্তির চেয়ে দলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যে কেউ দলে এলেই নিজেকে পরিবারের সদস্য মনে করতে পারে।
ঘুমহীন উৎসব
বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার পর দেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চং বলেন, দ্বীপের মানুষ যেন এখনও আনন্দে বিভোর। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও উচ্ছ্বাস কমেনি।
বিশ্বকাপ এলেই সাধারণত কুরাসাওয়ের মানুষ ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ এবার তাদের নিজেদের দেশই খেলছে। ফলে পুরো জাতি এক পতাকার নিচে একত্রিত হয়েছে।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
চং মনে করেন, কুরাসাওকে নিয়মিত বিশ্বকাপের দল হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তরুণদের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ছোট বয়স থেকেই খেলোয়াড় তৈরির জন্য প্রয়োজন উন্নত অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।
তার বিশ্বাস, কুরাসাওতে প্রতিভার অভাব নেই। ফুটবল, বেসবলসহ বিভিন্ন খেলায় দেশটির তরুণদের সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে কুরাসাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















