পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। দল থেকে বহিষ্কৃত নেতা এবং বর্তমানে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পাওয়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের ভেতরে জমে থাকা অসন্তোষ প্রকাশের কোনও সুযোগ ছিল না। তাঁর অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড়ে তোলা দল ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতছাড়া হয়ে অন্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগে মুখ খুললে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারত। আবার দল নির্বাচনে জিতলে চুপ থাকাও বাধ্যতামূলক হয়ে যেত। তাই পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ার পরই তিনি এবং তাঁর সমর্থকেরা প্রকাশ্যে অবস্থান নেন।
তিনি দাবি করেন, দলের ভেতরে অভিযোগ জানানোর কার্যকর কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বহু নেতা ও কর্মীর ক্ষোভ দীর্ঘদিন চাপা ছিল।

মনোনয়ন বঞ্চনা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা
ঋতব্রতের অভিযোগ, ভালো রাজনৈতিক কাজ করার পরও তাঁকে লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়নি। পরে বিধানসভা নির্বাচনে এমন একটি কেন্দ্রে পাঠানো হয়, যেখানে তাঁর সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল না।
নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি ও অসন্তোষের চিত্র দেখেছেন বলে দাবি করেন। তাঁর মতে, মাঠে নেমে কাজ করার সময়ই তিনি বুঝতে পারেন যে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে সমস্যা কতটা গভীরে পৌঁছেছে।
ভাঙনের পেছনে অন্য কোনও শক্তি?
তাঁদের বিরুদ্ধে শাসক দলের বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে যে এই বিভক্তির পেছনে ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থন রয়েছে। তবে সেই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন ঋতব্রত।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পর দলীয় বৈঠকে কিছু বিষয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করা হলেও তার কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। বরং নেতৃত্বের সমালোচনা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

তাঁর আরও দাবি, বিরোধী দলনেতা মনোনয়নের একটি নথিতে কয়েকজন বিধায়কের নাম স্বাক্ষর ছাড়াই যুক্ত করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও কোনও কার্যকর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, দীর্ঘ সময় দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পরও শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ খুব সীমিত ছিল। একাধিকবার ব্যক্তিগতভাবে আলোচনার চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি বলে দাবি করেন।
তাঁর মতে, দলীয় কাঠামোর ভেতরে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় অনেক নেতা নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করতে শুরু করেন। সেই পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত বর্তমান সংকটের দিকে নিয়ে গেছে।
বিজেপি-যোগের অভিযোগ খারিজ
বিজেপির মদতে তাঁরা কাজ করছেন— এমন অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন ঋতব্রত। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বিধায়কও হামলার শিকার হয়েছেন। যদি বিজেপির সমর্থন থাকত, তাহলে এমন ঘটনা ঘটত না বলেই তাঁর যুক্তি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, এই ভাঙন কি কেবল কয়েকজন নেতার বিদ্রোহ, নাকি এর প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে। রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















