পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক অস্থিরতাকে কেবল একটি দলীয় বিদ্রোহ হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা যাবে না। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা আসলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং জনআস্থার ক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। ঘটনাটি নেতৃত্বের লড়াইয়ের চেয়ে অনেক বেশি; এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক। দলীয় নেতৃত্ব এক প্রার্থীকে সামনে আনতে চাইলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক অন্য একজনকে সমর্থন করেন। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ সামনে আসে এবং তা পুলিশি তদন্তের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। অভিযোগকারী দুই বিধায়ককে দল থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত সমস্যার সমাধান তো করেনিই, বরং বিদ্রোহকে আরও প্রকাশ্য করে তুলেছে।
তবে এই সংকটের শিকড় অনেক গভীরে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর একটি সাধারণ সমস্যা হলো, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের ভেতরের সমালোচনামূলক কণ্ঠগুলোকে দুর্বল করে ফেলে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর ছোট হতে থাকে, নেতৃত্বের চারপাশে একটি নির্দিষ্ট বলয় তৈরি হয় এবং সাংগঠনিক মতবিনিময়ের জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই লক্ষণ স্পষ্ট।
এই বিদ্রোহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, বিদ্রোহীরা দল ছাড়ার কথা বলছেন না। তাঁরা নিজেদেরই প্রকৃত তৃণমূল বলে দাবি করছেন এবং দল প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখনও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরছেন। অর্থাৎ বিরোধিতা মূলত দলীয় কাঠামোর একটি অংশ ও ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে, দলের অস্তিত্ব বা আদর্শ নিয়ে নয়। এ কারণেই পরিস্থিতি আরও জটিল। যখন বিদ্রোহীরা নেতৃত্বকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করে বরং নেতৃত্বের ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে চায়, তখন সংকটকে কেবল শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ক্ষোভের বড় অংশটি একটি নির্দিষ্ট নেতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত হলেও সমস্যাটিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ রাজনৈতিক সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ তখনই বিস্ফোরিত হয়, যখন তা দীর্ঘ সময় ধরে জমা হতে থাকে। কোনো একটি ঘটনা কেবল বিস্ফোরণের সূত্রপাত ঘটায়।
তবে তৃণমূলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিধায়ক বিদ্রোহ নয়। প্রকৃত সংকট জনমনে তৈরি হওয়া ধারণা। গত কয়েক বছরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগে দলের বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ—এসব ঘটনাই সাধারণ মানুষের মধ্যে দলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে আজকের বিদ্রোহকে অনেক ভোটার বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না; বরং তাঁরা এটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি ছিল তাঁর জনসংযোগ, সংগ্রামী ভাবমূর্তি এবং বিকল্প রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণের সক্ষমতা। কিন্তু দীর্ঘ ক্ষমতাসীনতার ফলে সেই নৈতিক সুবিধা আগের মতো কার্যকর আছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। কারণ কোনো রাজনৈতিক দল কেবল সাংগঠনিক শক্তির ওপর টিকে থাকে না; জনআস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী দিনে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আদালত, তদন্ত বা বিধানসভার কৌশলগত লড়াই দিয়ে নয়, বরং দলটি নিজের ভেতরের সংকট কতটা স্বীকার করতে পারে এবং জনগণের হারানো বিশ্বাস কতটা পুনর্গঠন করতে পারে, তার ওপর। বিদ্রোহী বিধায়কদের সামলানো হয়তো সম্ভব। কিন্তু যদি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ গভীর হতে থাকে, তাহলে সেটিই হবে এমন এক চ্যালেঞ্জ, যা কোনো সাংগঠনিক শাস্তি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না।
শিব সহায় সিংহ 



















