পূর্ব আফ্রিকা ও মধ্য ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু সক্রিয় ও প্রাচীন আগ্নেয়গিরিকে বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও এগুলোর উৎস পৃথিবীর অনেক গভীরে একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, এসব আগ্নেয়গিরির পেছনে পৃথিবীর ম্যান্টলের গভীরে থাকা অন্তত তিনটি পৃথক অঞ্চল ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণাটি সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা ভূমিকম্পের তরঙ্গ ব্যবহার করে পৃথিবীর অভ্যন্তরের ত্রিমাত্রিক চিত্র তৈরির পদ্ধতি এবং আগ্নেয়শিলার রাসায়নিক বিশ্লেষণ—এই দুই ধরনের তথ্য একত্র করেছেন। ভূমিকম্পের তরঙ্গকে অনেকটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সিটি স্ক্যানের মতো ব্যবহার করে পৃথিবীর গভীরের গঠন শনাক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, লাভা ভূ-পৃষ্ঠে উঠে আসার সময় গভীরের যে উপাদানের চিহ্ন বহন করে, তা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়েছে।
গভীরের উৎস খুঁজতে জটিল পথের সন্ধান
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথিবী ও গ্রহবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক এবং গবেষণাটির প্রধান লেখক শিয়ুয়ান বাও বলেন, কিছু আগ্নেয়গিরির উপাদান ঠিক কোথা থেকে আসে, তা শনাক্ত করা দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ।
গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন অঞ্চলের আগ্নেয়শিলার রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এক নয়। এতে ধারণা করা যায়, ভূগর্ভের ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে উপাদান উঠে আসছে। তবে পৃথিবীর গভীর থেকে গলিত পদার্থ সরাসরি উল্লম্ব পথে ওপরে উঠে আসে না। অভ্যন্তরীণ জটিল কাঠামোর কারণে এর গতিপথ বাঁকতে, বিভক্ত হতে কিংবা অন্যদিকে ঘুরে যেতে পারে।
গবেষকেরা এই প্রক্রিয়াকে মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা বিশাল গাছের শিকড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কোনো শিকড় যেমন বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে, কোনোটি বাধা এড়িয়ে বাঁক নেয়, গভীরের উত্তপ্ত পদার্থের প্রবাহও তেমন জটিল পথে চলতে পারে।
আট আগ্নেয় অঞ্চল নিয়ে অনুসন্ধান
গবেষকেরা আফারের ইথিওপিয়া, পূর্ব আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চল, কোমোরোস দ্বীপপুঞ্জ, রিইউনিয়ন, মারিয়ন, ক্রোজে, কেরগেলেন এবং আমস্টারডাম-সেন্ট পল—এই আটটি আগ্নেয় অঞ্চলের সম্ভাব্য গভীর উৎসের সঙ্গে সংযোগ খুঁজেছেন।
ফলাফলে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য একটি নির্দিষ্ট ও নিশ্চিত পথ পাওয়া যায়নি। বরং সম্ভাব্য একাধিক পথের সন্ধান মিলেছে। কিছু পথ অপেক্ষাকৃত ছোট, কিছু এমন এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে যেখানে ভূমিকম্পের তরঙ্গ ধীরগতিতে চলে। আবার কোনো কোনো পথ গভীরের দিকে যাওয়ার সময় স্পষ্টভাবে দিক পরিবর্তন করেছে।
গবেষকদের মতে, এই অনিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পৃথিবীর অভ্যন্তরের কাঠামো সরল নয়। তবু সামগ্রিকভাবে দেখা গেছে, সব আগ্নেয় অঞ্চল একটি অভিন্ন গভীর উৎসের সঙ্গে যুক্ত নয়। বরং এগুলোর পেছনে পৃথিবীর গভীরে থাকা ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল কাজ করছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
রাসায়নিক ‘আঙুলের ছাপেও’ মিল
গবেষণার দ্বিতীয় ধাপে আগ্নেয়শিলায় স্ট্রনশিয়াম, নিওডিমিয়াম ও সিসার বিভিন্ন আইসোটোপ বিশ্লেষণ করা হয়। একই মৌলের ভিন্ন ধরনের এই আইসোটোপগুলো কোনো ভূতাত্ত্বিক উপাদানের উৎস ও দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তনের এক ধরনের রাসায়নিক পরিচয় বহন করতে পারে।
ভূমিকম্পের তরঙ্গ থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে আগ্নেয়শিলার রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে গবেষকেরা তিনটি প্রধান গোষ্ঠী শনাক্ত করেছেন। প্রথম গোষ্ঠীতে রয়েছে আফার, পূর্ব আফ্রিকা ও কোমোরোস। দ্বিতীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত রিইউনিয়ন। তৃতীয় গোষ্ঠীতে রয়েছে মারিয়ন, ক্রোজে, কেরগেলেন এবং আমস্টারডাম-সেন্ট পল।
এই ফলাফল ইঙ্গিত করছে, আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরের গভীরে থাকা আফ্রিকান লার্জ লো শিয়ার ভেলোসিটি প্রভিন্স নামে বিশাল কাঠামোটি একক ও অভিন্ন কোনো ভর নয়। এর ভেতরে অন্তত তিনটি পৃথক গভীর অঞ্চল থাকতে পারে।
তাপমাত্রা নাকি প্রাচীন রাসায়নিক উপাদান?
গবেষণাটির বড় প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর গভীরের এই বিশাল কাঠামো কি কেবল অতিরিক্ত উত্তপ্ত, নাকি এর মধ্যে ভিন্ন রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের প্রাচীন উপাদানও সংরক্ষিত রয়েছে।
গবেষণার ফল দ্বিতীয় সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে। শুধু তাপমাত্রার পার্থক্য থাকলে গভীর উৎসগুলো পরস্পরের তুলনায় বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার কথা। কিন্তু ভূমিকম্পের চিত্র এবং আগ্নেয়শিলার রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য—দুই ক্ষেত্রেই পৃথক অঞ্চলের উপস্থিতি দেখা গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পৃথিবীর গভীরে ভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময় ধরে পুরোপুরি মিশে যায়নি।
তবে গবেষকেরা পৃথিবীর গভীর থেকে আগ্নেয়গিরি পর্যন্ত সরু কোনো নির্দিষ্ট ‘নল’-এর নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করেননি। তাঁরা বরং প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে এমন বৃহৎ উৎস অঞ্চল শনাক্ত করেছেন। পাশাপাশি, ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা যেখানে কম, সেখানে ভূ-অভ্যন্তরের চিত্রও তুলনামূলকভাবে কম স্পষ্ট। ফলে গভীর থেকে ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত উত্তপ্ত পদার্থ ঠিক কীভাবে প্রবাহিত হয়, তা নিয়ে এখনো কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
Sarakhon Report 



















