দুই দশক আগে ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছিল বলে মনে করা হয়েছিল। সেই শিক্ষা ছিল, সামরিক শক্তি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলানোর চেষ্টা প্রায়শই বিপর্যয়ে গিয়ে শেষ হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, জনমত বদলালেও ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি-নির্ধারণী মহল খুব বেশি বদলায়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া পূর্ণমাত্রার যুদ্ধকে অনেকদিন ধরেই সমর্থন করে আসছিলেন ওয়াশিংটনের তথাকথিত ‘হক’ বা যুদ্ধপন্থী নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকেরা। তাদের দাবি ছিল, সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা যাবে, পারমাণবিক সক্ষমতা নির্মূল করা সম্ভব হবে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটির শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। বাস্তবতা এখন ভিন্ন এক গল্প বলছে।
যুদ্ধের মূল্য এবং অর্জনের ফারাক
যে যুদ্ধকে দ্রুত ও কার্যকর সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেটি এখন বিপুল অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতির প্রতীক হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে। প্রাণহানি ও মানবিক দুর্ভোগের মাত্রাও উদ্বেগজনক।

কিন্তু এত বিপুল মূল্য চুকিয়েও ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে বলে মনে হয় না। ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিও চূড়ান্তভাবে বন্ধ করা যায়নি। বরং অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ইরান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার নিজের সক্ষমতা নতুন করে প্রদর্শন করেছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যদি একটি যুদ্ধ তার ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয় এবং বিপরীতে নতুন সংকট সৃষ্টি করে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কী কোনো জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়?
ইরাকের শিক্ষা কেন হারিয়ে গেল
ইরাক যুদ্ধের পর আমেরিকান জনগণের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে সেই অভিযান ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত। নির্বাচনী রাজনীতিতেও এর প্রভাব দেখা গিয়েছিল। যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নেওয়া বা অন্তত সেই অবস্থানের দাবি করা রাজনীতিকেরা জনসমর্থন পেয়েছিলেন।
কিন্তু জনমতের পরিবর্তন এবং নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তন এক বিষয় নয়। নির্বাচনে কিছু রাজনৈতিক মূল্য দিতে হলেও, যুদ্ধকে সমর্থন করা বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ, নীতিনির্ধারণী ভূমিকা কিংবা প্রভাবশালী বিশ্লেষক হিসেবে তাদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। ফলে যুদ্ধের পক্ষে যে চিন্তাধারা একসময় ইরাকে ব্যর্থ হয়েছিল, সেটি কখনো সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি।
এই বাস্তবতা একটি গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। যদি ভুল সিদ্ধান্তের জন্য পেশাগত বা বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো মূল্য দিতে না হয়, তাহলে একই ধরনের ভুল পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।

জবাবদিহির অনুপস্থিতি
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পররাষ্ট্রনীতি বিশেষভাবে জটিল একটি ক্ষেত্র, যেখানে অনিশ্চয়তা সবসময় থাকে। কিন্তু ভুলের পর আত্মসমালোচনা এবং শিক্ষা গ্রহণ না হওয়াই প্রকৃত সমস্যা।
যেসব বিশ্লেষক, গবেষক বা নীতিনির্ধারক অতীতে ব্যর্থ সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই আবারও নতুন সামরিক পদক্ষেপের প্রধান সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাদের পূর্ববর্তী পূর্বাভাস বা মূল্যায়ন কতটা ভুল ছিল, সেই প্রশ্ন প্রায়ই জনসমক্ষে গুরুত্ব পায় না।
একটি সুস্থ নীতিনির্ধারণী সংস্কৃতিতে প্রত্যাশা করা যায় যে ভুল প্রমাণিত হওয়া ব্যক্তিরা অন্তত তাদের মৌলিক ধারণাগুলো পুনর্বিবেচনা করবেন। তারা ব্যাখ্যা করবেন কেন তাদের বিশ্লেষণ ব্যর্থ হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ভুল এড়াতে কী পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু ওয়াশিংটনে প্রায়ই দেখা যায়, অতীতের ভুল যেন নতুন বিতর্কে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়।
সামরিক শক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতা হলো, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই সামরিক বিকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আনার পরিবর্তে চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তির মাধ্যমে নতি স্বীকার করানোর চিন্তা বহু বছর ধরে নীতিনির্ধারণী মহলে প্রভাবশালী।

কিন্তু ইরাক, আফগানিস্তান এবং এখন ইরানের অভিজ্ঞতা দেখায় যে রাষ্ট্র ও সমাজের জটিল বাস্তবতা শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে বদলানো যায় না। অনেক সময় যুদ্ধ প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার পরিবর্তে আরও সংগঠিত ও দৃঢ় করে তোলে।
কূটনীতি ধীর, বিরক্তিকর এবং প্রায়ই অসম্পূর্ণ ফল দেয়। তবুও দীর্ঘমেয়াদে তা যুদ্ধের তুলনায় অনেক কম ব্যয়বহুল এবং কম ধ্বংসাত্মক। এই বাস্তবতা বারবার সামনে এলেও ওয়াশিংটনের একটি অংশ এখনও সামরিক সমাধানের প্রতি আকৃষ্ট।
ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা
সম্প্রতি কংগ্রেসে ইরান যুদ্ধ সীমিত করার উদ্যোগ দেখায় যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার কিছু অংশ অন্তত জনমতের পরিবর্তন বুঝতে শুরু করেছে। তবে এটিকে বড় কোনো পরিবর্তনের সূচনা বলা এখনও সময়ের আগে হবে।
প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য শুধু একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধের সমালোচনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সেই মানসিকতা ও নীতিগত কাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন, যা বারবার সামরিক হস্তক্ষেপকে সহজ সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করে।
যদি সেই আত্মসমালোচনা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও নতুন নতুন সংঘাত দেখা দিতে পারে। আর সেগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অবস্থানকেই দুর্বল করবে না, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জনগণের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই—ব্যর্থ যুদ্ধের মূল্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তিতেও গিয়ে জমা হয়।
পিটার বেইনার্ট 



















