০১:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজারে ফিরেছে প্রাণ, কৃষকের আয়ে নতুন গতি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম কর্মসূচি: সাভারে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন হাফিজ উদ্দিন পদ্মায় ফেরি থেকে ঝাঁপ, প্রায় চার ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার নারী শান্তৌ কেন ব্যর্থ, শেনঝেনের সাফল্যের গল্পে চীনের অর্থনীতির বড় শিক্ষা সারনাথ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়, ভারতের ৪৫তম ঐতিহাসিক স্থাপনা পোষ্যবান্ধব বাসার খোঁজ কমেছে ৫৪ শতাংশ, আইন বদলের পর বদলেছে ভাড়াটিয়াদের আচরণ ক্যালিফোর্নিয়ার সৈকতে সি লায়নকে লাথি, তদন্তে মার্কিন ফেডারেল কর্তৃপক্ষ ভারতের মাটিতে পিরেলির ২০২৭ দিনপঞ্জি, এক ফ্রেমে ভারতীয় নারীর বহুরূপী সৌন্দর্য সানস্ক্রিনে ক্যানসার হয়—ভুয়া দাবিতে বাড়ছে উদ্বেগ বার্লিনে সমকামী অধিকার উৎসবের কাছে গাড়িচাপা, নিহত ১ আহত ১৬

পেলের বিদায়: যেভাবে বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষবারের মতো সিংহাসনে উঠেছিলেন ফুটবলের রাজা

মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে তখন উল্লাসের বিস্ফোরণ। শেষ বাঁশি বাজতেই হাজার হাজার সমর্থক মাঠে নেমে আসেন। চারদিকে শুধু চিৎকার, উন্মাদনা আর আনন্দের ঢেউ। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেও এক মানুষ যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চোখে জল, মুখে তৃপ্তির ছাপ। তিনি পেলে। ফুটবলের রাজা, যিনি সেদিন শুধু একটি ম্যাচ জেতেননি, শেষ করেছিলেন এক অবিস্মরণীয় বিশ্বকাপ অধ্যায়।

১৯৭০ সালের ২১ জুন। ব্রাজিল ও ইতালির মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনাল। স্কোরবোর্ডে ব্রাজিলের ৪-১ ব্যবধানের জয় লেখা থাকলেও ম্যাচটির আসল গল্প ছিল একজন কিংবদন্তির বিদায়কে ঘিরে।

কিশোর বিস্ময় থেকে বিশ্বতারকা

পেলের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে সুইডেনের মাটিতে তিনি এমন পারফরম্যান্স দেখান, যা পুরো ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করে। ফাইনালে গোল, দুর্দান্ত নৈপুণ্য এবং বিশ্বকাপ জয়—সব মিলিয়ে এক রাতেই তিনি হয়ে ওঠেন ফুটবলের নতুন রাজপুত্র।

The King' Pele: A lifetime of football memories | Football News | Al Jazeera

চার বছর পর ব্রাজিল আবারও বিশ্বকাপ জেতে। তবে চোটের কারণে সেই আসরে পেলের ভূমিকা সীমিত ছিল। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের কঠোর ট্যাকলের শিকার হয়ে তিনি ভীষণভাবে হতাশ হন। টুর্নামেন্ট শেষে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, আর কখনও বিশ্বকাপ খেলবেন না।

কিন্তু ফুটবল এবং সমর্থকদের ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনে।

পরিণত পেলের শ্রেষ্ঠ রূপ

১৯৭০ সালের পেলে আর আগের সেই কিশোর ছিলেন না। তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ, পরিণত এবং খেলার গভীরতম দিকগুলো বোঝা এক পূর্ণাঙ্গ ফুটবলার।

সেই ব্রাজিল দলকে এখনও অনেকেই ইতিহাসের সেরা জাতীয় দল বলে মনে করেন। জাইরজিনিয়ো প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছেন। রিভেলিনোর বাঁ পায়ের জাদু ছিল চোখে পড়ার মতো। তোস্তাও ছিলেন বুদ্ধিদীপ্ত ফরোয়ার্ড। আর অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন পেছন থেকে।

তবে এই নক্ষত্রখচিত দলের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন একজনই—পেলে।

Remembering Pele, the King of the World

পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি শুধু গোল করেননি, তৈরি করেছেন এমন সব মুহূর্ত, যা আজও ফুটবল ইতিহাসের অংশ। মাঝমাঠ থেকে নেওয়া সাহসী শট, গোলরক্ষককে ফাঁকি দেওয়া অসাধারণ মুভ কিংবা নিখুঁত পাস—সবকিছুতেই ছিল তার স্বাক্ষর।

ফাইনালের সেই স্মরণীয় দিন

ফাইনালের ১৮ মিনিটে আসে প্রথম গোল। ডান দিক থেকে ভেসে আসা ক্রসে পেলে ইতালির ডিফেন্ডারদের ওপর দিয়ে লাফিয়ে উঠে শক্তিশালী হেডে বল জালে পাঠান। মুহূর্তটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা হেড হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইতালি একবার সমতায় ফিরলেও ব্রাজিলের আক্রমণ থামানো সম্ভব হয়নি। একের পর এক আক্রমণে তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।

এরপর আসে সেই গোল, যেটিকে অনেকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা দলগত গোল বলে মনে করেন। ধারাবাহিক পাসের পর বল পৌঁছে যায় পেলের কাছে। তিনি মাথা তুলে দেখেন ডান দিক দিয়ে ছুটে আসছেন কার্লোস আলবার্তো। এক নিখুঁত পাসে বল তুলে দেন তার সামনে। আলবার্তো প্রথম স্পর্শেই জালে বল পাঠান।

স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-১। ম্যাচ শেষ। বিশ্বকাপ শেষ। আর শেষ হয়ে যায় পেলের বিশ্বকাপ অধ্যায়ও।

রাজকীয় বিদায়

খেলা শেষে জুলে রিমে ট্রফি হাতে তুলে নেন পেলে। তার চোখে তখন ছিল অর্জনের আনন্দ এবং বিদায়ের আবেগ।

Final farewell for Pele, Brazil's football 'King' | Football News - Times  of India

ইতালির খেলোয়াড় রবার্তো রোসাতো তার জার্সি চাইলে পেলে হাসিমুখে সেটি খুলে তাকে দিয়ে দেন। মাঠজুড়ে তখন আবেগঘন দৃশ্য।

এর কিছুক্ষণ পর অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো এগিয়ে এসে পেলেকে কাঁধে তুলে নেন। যে মানুষটি বছরের পর বছর পুরো দলকে এগিয়ে নিয়েছেন, সেদিন তাকেই বহন করছিলেন সতীর্থরা।

মাঠের ভিড়, ক্যামেরার ঝলকানি আর উন্মত্ত উদযাপনের মাঝখানে পেলে যেন ফুটবলের অদৃশ্য সিংহাসনে বসে ছিলেন। মাথায় মেক্সিকান টুপি, মুখে চিরচেনা হাসি, আকাশের দিকে তোলা মুষ্টিবদ্ধ হাত—দৃশ্যটি হয়ে ওঠে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী মুহূর্ত।

পরে সেই মুহূর্তের অনুভূতি জানতে চাইলে পেলে বলেছিলেন, “এর পর আর কী বাকি থাকে?”

এই কথার মধ্যে ছিল না কোনো আক্ষেপ। বরং ছিল পরিপূর্ণতার অনুভূতি। একজন মানুষ, যিনি নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন এবং বিনিময়ে পেয়েছেন বিশ্বজয়ের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।

সেদিন কার্লোস আলবার্তো পেলেকে কাঁধে তুলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে বছরের পর বছর পেলে-ই বহন করেছিলেন পুরো ব্রাজিলকে। ১৯৭০ সালের সেই দিন তিনি শুধু কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিয়েছিলেন।

এভাবেই বিদায় নেন রাজারা।

Why is Pele the king of football?

 

জনপ্রিয় সংবাদ

পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজারে ফিরেছে প্রাণ, কৃষকের আয়ে নতুন গতি

পেলের বিদায়: যেভাবে বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষবারের মতো সিংহাসনে উঠেছিলেন ফুটবলের রাজা

১২:১৪:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬

মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে তখন উল্লাসের বিস্ফোরণ। শেষ বাঁশি বাজতেই হাজার হাজার সমর্থক মাঠে নেমে আসেন। চারদিকে শুধু চিৎকার, উন্মাদনা আর আনন্দের ঢেউ। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেও এক মানুষ যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চোখে জল, মুখে তৃপ্তির ছাপ। তিনি পেলে। ফুটবলের রাজা, যিনি সেদিন শুধু একটি ম্যাচ জেতেননি, শেষ করেছিলেন এক অবিস্মরণীয় বিশ্বকাপ অধ্যায়।

১৯৭০ সালের ২১ জুন। ব্রাজিল ও ইতালির মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনাল। স্কোরবোর্ডে ব্রাজিলের ৪-১ ব্যবধানের জয় লেখা থাকলেও ম্যাচটির আসল গল্প ছিল একজন কিংবদন্তির বিদায়কে ঘিরে।

কিশোর বিস্ময় থেকে বিশ্বতারকা

পেলের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে সুইডেনের মাটিতে তিনি এমন পারফরম্যান্স দেখান, যা পুরো ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করে। ফাইনালে গোল, দুর্দান্ত নৈপুণ্য এবং বিশ্বকাপ জয়—সব মিলিয়ে এক রাতেই তিনি হয়ে ওঠেন ফুটবলের নতুন রাজপুত্র।

The King' Pele: A lifetime of football memories | Football News | Al Jazeera

চার বছর পর ব্রাজিল আবারও বিশ্বকাপ জেতে। তবে চোটের কারণে সেই আসরে পেলের ভূমিকা সীমিত ছিল। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের কঠোর ট্যাকলের শিকার হয়ে তিনি ভীষণভাবে হতাশ হন। টুর্নামেন্ট শেষে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, আর কখনও বিশ্বকাপ খেলবেন না।

কিন্তু ফুটবল এবং সমর্থকদের ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনে।

পরিণত পেলের শ্রেষ্ঠ রূপ

১৯৭০ সালের পেলে আর আগের সেই কিশোর ছিলেন না। তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ, পরিণত এবং খেলার গভীরতম দিকগুলো বোঝা এক পূর্ণাঙ্গ ফুটবলার।

সেই ব্রাজিল দলকে এখনও অনেকেই ইতিহাসের সেরা জাতীয় দল বলে মনে করেন। জাইরজিনিয়ো প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছেন। রিভেলিনোর বাঁ পায়ের জাদু ছিল চোখে পড়ার মতো। তোস্তাও ছিলেন বুদ্ধিদীপ্ত ফরোয়ার্ড। আর অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন পেছন থেকে।

তবে এই নক্ষত্রখচিত দলের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন একজনই—পেলে।

Remembering Pele, the King of the World

পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি শুধু গোল করেননি, তৈরি করেছেন এমন সব মুহূর্ত, যা আজও ফুটবল ইতিহাসের অংশ। মাঝমাঠ থেকে নেওয়া সাহসী শট, গোলরক্ষককে ফাঁকি দেওয়া অসাধারণ মুভ কিংবা নিখুঁত পাস—সবকিছুতেই ছিল তার স্বাক্ষর।

ফাইনালের সেই স্মরণীয় দিন

ফাইনালের ১৮ মিনিটে আসে প্রথম গোল। ডান দিক থেকে ভেসে আসা ক্রসে পেলে ইতালির ডিফেন্ডারদের ওপর দিয়ে লাফিয়ে উঠে শক্তিশালী হেডে বল জালে পাঠান। মুহূর্তটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা হেড হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইতালি একবার সমতায় ফিরলেও ব্রাজিলের আক্রমণ থামানো সম্ভব হয়নি। একের পর এক আক্রমণে তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।

এরপর আসে সেই গোল, যেটিকে অনেকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা দলগত গোল বলে মনে করেন। ধারাবাহিক পাসের পর বল পৌঁছে যায় পেলের কাছে। তিনি মাথা তুলে দেখেন ডান দিক দিয়ে ছুটে আসছেন কার্লোস আলবার্তো। এক নিখুঁত পাসে বল তুলে দেন তার সামনে। আলবার্তো প্রথম স্পর্শেই জালে বল পাঠান।

স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-১। ম্যাচ শেষ। বিশ্বকাপ শেষ। আর শেষ হয়ে যায় পেলের বিশ্বকাপ অধ্যায়ও।

রাজকীয় বিদায়

খেলা শেষে জুলে রিমে ট্রফি হাতে তুলে নেন পেলে। তার চোখে তখন ছিল অর্জনের আনন্দ এবং বিদায়ের আবেগ।

Final farewell for Pele, Brazil's football 'King' | Football News - Times  of India

ইতালির খেলোয়াড় রবার্তো রোসাতো তার জার্সি চাইলে পেলে হাসিমুখে সেটি খুলে তাকে দিয়ে দেন। মাঠজুড়ে তখন আবেগঘন দৃশ্য।

এর কিছুক্ষণ পর অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো এগিয়ে এসে পেলেকে কাঁধে তুলে নেন। যে মানুষটি বছরের পর বছর পুরো দলকে এগিয়ে নিয়েছেন, সেদিন তাকেই বহন করছিলেন সতীর্থরা।

মাঠের ভিড়, ক্যামেরার ঝলকানি আর উন্মত্ত উদযাপনের মাঝখানে পেলে যেন ফুটবলের অদৃশ্য সিংহাসনে বসে ছিলেন। মাথায় মেক্সিকান টুপি, মুখে চিরচেনা হাসি, আকাশের দিকে তোলা মুষ্টিবদ্ধ হাত—দৃশ্যটি হয়ে ওঠে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী মুহূর্ত।

পরে সেই মুহূর্তের অনুভূতি জানতে চাইলে পেলে বলেছিলেন, “এর পর আর কী বাকি থাকে?”

এই কথার মধ্যে ছিল না কোনো আক্ষেপ। বরং ছিল পরিপূর্ণতার অনুভূতি। একজন মানুষ, যিনি নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন এবং বিনিময়ে পেয়েছেন বিশ্বজয়ের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।

সেদিন কার্লোস আলবার্তো পেলেকে কাঁধে তুলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে বছরের পর বছর পেলে-ই বহন করেছিলেন পুরো ব্রাজিলকে। ১৯৭০ সালের সেই দিন তিনি শুধু কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিয়েছিলেন।

এভাবেই বিদায় নেন রাজারা।

Why is Pele the king of football?