প্রকৃতির এক ভয়াবহ দুর্যোগ কখনও কখনও মানুষের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। কিংবদন্তি সঙ্গীত প্রযোজক, গীতিকার ও পিয়ানোবাদক অ্যালেন তুসাঁর জীবনও এমনই এক মোড় নিয়েছিল। ২০০৫ সালে হারিকেন ক্যাটরিনার আঘাতে নিউ অরলিন্স ছেড়ে নিউইয়র্কে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। সেই বাধ্যতামূলক স্থানান্তরই পরবর্তীতে তাঁর শিল্পীজীবনের এক নতুন উত্থানের পথ খুলে দেয়।
দীর্ঘদিনের পর্দার আড়ালের তারকা
অ্যালেন তুসাঁ বহু জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা ও প্রযোজক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর লেখা ও প্রযোজিত গান বহু শিল্পীকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিলেও তিনি নিজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে কখনও আগ্রহী ছিলেন না। স্টুডিওতেই তিনি সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন।
তবে পিয়ানোর সামনে বসলে যেন অন্য এক তুসাঁকে দেখা যেত। সেখানেই তিনি নিজের শিল্পীসত্তার পূর্ণ প্রকাশ ঘটাতেন।
নিউইয়র্কে নতুন পরিচয়

ক্যাটরিনার পর নিউইয়র্কে এসে তিনি একটি জনপ্রিয় সঙ্গীতমঞ্চে নিয়মিত পরিবেশনা শুরু করেন। ২০০৫ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে চল্লিশেরও বেশি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি দর্শকদের সামনে নিজের স্মৃতি, গল্প ও গান উজাড় করে দেন।
নিজের সৃষ্টির পাশাপাশি অন্য শিল্পীদের গানও পরিবেশন করেন তিনি। শৈশব, পরিবার এবং নিউ অরলিন্সের স্মৃতি ঘিরে তাঁর আবেগঘন কথামালা দর্শকদের মুগ্ধ করত। ধীরে ধীরে তিনি শুধু সফল গীতিকার নন, একজন অসাধারণ মঞ্চশিল্পী হিসেবেও স্বীকৃতি পেতে শুরু করেন।
দর্শকদের সঙ্গে গড়ে ওঠে বিশেষ সম্পর্ক
তুসাঁর পরিবেশনায় ছিল আন্তরিকতা ও সহজাত উষ্ণতা। অনুষ্ঠান শেষে দীর্ঘ সময় ধরে ভক্তদের সঙ্গে কথা বলা, অটোগ্রাফ দেওয়া এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ বজায় রাখার মাধ্যমে তিনি এক অনন্য সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন।
সঙ্গীতপ্রেমীরা তাঁর গভীর কণ্ঠ, পিয়ানোর দক্ষতা এবং গল্প বলার ক্ষমতায় মুগ্ধ হতেন। অনেকের কাছেই এই সময়টি ছিল তাঁর শিল্পীজীবনের পুনর্জন্ম।
‘সংবুক’-এ সংরক্ষিত এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

তুসাঁর নিউইয়র্ক অধ্যায়কে ধারণ করে প্রকাশিত হয়েছিল ‘সংবুক’ নামের একটি অ্যালবাম। সম্প্রতি এর বর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। নতুন সংস্করণে আগে প্রকাশ না পাওয়া কয়েকটি গান এবং দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের অংশ যুক্ত করা হয়েছে।
এই অ্যালবাম শুধু গান নয়, একজন শিল্পীর আত্মপ্রকাশ ও পুনর্গঠনের দলিল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এতে ধরা পড়েছে তাঁর সঙ্গীতচিন্তা, স্মৃতিচারণ এবং শিল্পীসত্তার গভীরতা।
নিউ অরলিন্স থেকে বিশ্বমঞ্চে
নিউ অরলিন্সের এক সাধারণ এলাকায় বেড়ে ওঠা তুসাঁ কৈশোরেই পিয়ানো শেখা শুরু করেন। পরে তিনি স্থানীয় সঙ্গীতজগতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। গীতিকার, সুরকার, প্রযোজক ও সংগঠক—সব ভূমিকাতেই তিনি সমান দক্ষ ছিলেন।
সঙ্গীতবোদ্ধাদের মতে, বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠ ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী গান তৈরি করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। এ কারণেই তাঁর কাজ দশকের পর দশক ধরে শ্রোতাদের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক থেকেছে।

দুর্যোগ থেকে প্রেরণা
ক্যাটরিনার সময় নিজের বাড়ি, পিয়ানো এবং বহু মূল্যবান স্মারক পেছনে ফেলে পালাতে হয়েছিল তুসাঁকে। কিন্তু সেই ক্ষতির মধ্যেও তিনি নতুন শহরে নতুন অনুপ্রেরণা খুঁজে পান।
নিউইয়র্কের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে শহরের নানা শব্দ, মানুষের চলাচল এবং নগরজীবনের ছন্দ তাঁকে নতুন সৃষ্টিশীল শক্তি জুগিয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি আবার নিউ অরলিন্সে ফিরে গেলেও নিউইয়র্কের সেই সময় তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকে।
২০১৫ সালে ৭৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হলেও সঙ্গীতজগতে তাঁর প্রভাব আজও অটুট। নতুন সংস্করণের ‘সংবুক’ আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে এক দুর্যোগ একজন শিল্পীর জীবনকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















