কয়েক মাস আগেও ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল, প্রবৃদ্ধিও ছিল শক্তিশালী। তবে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং জ্বালানি সরবরাহে বাধা ভারতের অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশটির অর্থনীতি ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
তেলের ওপর অতিনির্ভরতার মূল্য
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রভাব সরাসরি দেশটির অর্থনীতিতে পড়ে।
ইরান সংকটের পর বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভারতের আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে বিশ্লেষকদের মতে সমস্যার মূল কারণ এখনো রয়ে গেছে।

মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সার সরবরাহেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে সম্ভাব্য খরার ঝুঁকিও রয়েছে, যা খাদ্য উৎপাদন ও বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব কারণে ভারতের অর্থনীতি একাধিক সরবরাহ সংকটের মুখে পড়তে পারে। এর প্রভাব পড়বে উৎপাদন, পরিবহন এবং ভোক্তা ব্যয়ের ওপর। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হতে পারে।
সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ
সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি কর কমিয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ভর্তুকি ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে কৃষি খাতের জন্য সারের ভর্তুকি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এসব পদক্ষেপের ফলে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমে গেলে সরকার লভ্যাংশ থেকেও কম আয় পেতে পারে। ফলে বাজেট ঘাটতি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সুদের হার বাড়ার ইঙ্গিত
জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর নীতি নিতে হতে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, আগামী মাসগুলোতে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সুদের হার বৃদ্ধি পেলে ঋণের খরচ বাড়বে, যা বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও ধীর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সামনে অনিশ্চয়তার পথ
ভারতের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি কঠিন পরিস্থিতি, কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দিন দিন আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।
যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত সমাধান না হয় এবং জ্বালানির দাম উচ্চ পর্যায়ে থেকে যায়, তাহলে ভারতের অর্থনীতিতে এর প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















