কুষ্টিয়া শহরে জামায়াতে ইসলামীর কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজার ব্যক্তিগত গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার বিকেল পৌনে ৬টার দিকে শহরের ছয়রাস্তা মোড়ে থানাপাড়া জামিয়া মসজিদের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
হামলায় গাড়িটির পেছনের কাচ ভেঙে যায়। গাড়ির বিভিন্ন অংশেও ইটের আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। তবে এ ঘটনায় আমির হামজা আহত হননি বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির খন্দকার এ কে এম আলী মোহসীন।
যে কারণে উত্তেজনার সূত্রপাত
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমির হামজা সম্প্রতি গণঅধিকার পরিষদকে নিয়ে একটি বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে শনিবার বিকেলে ছয়রাস্তা মোড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করে গণঅধিকার পরিষদ।
বিকেল পৌনে ৬টার দিকে আমির হামজা নিজের গাড়িতে করে ওই মোড় অতিক্রম করে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় সমাবেশ থেকে স্লোগান দেওয়া শুরু হলে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি স্লোগান ও উত্তেজনা তৈরি হয়। আমির হামজার গাড়ির সামনে ও পেছনে তখন পুলিশের একাধিক গাড়ি ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একপর্যায়ে গণঅধিকার পরিষদ ও আমির হামজার সঙ্গে থাকা জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। দুই পক্ষের মধ্যে ইট-পাটকেল ছোড়াছুড়িও হয়। এতে আমির হামজার গাড়ির কাচ ভেঙে যায় এবং গাড়ির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা আমির হামজাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে নিয়ে যান। পরে গাড়িটিও তাঁদের পেছনে যায়।
প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ও র্যাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।
একে অপরকে দায়ী করল দুই পক্ষ
কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির খন্দকার এ কে এম আলী মোহসীন দাবি করেন, গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা প্রথমে হামলা করেন। পরে বিএনপির ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁর দাবি, আমির হামজা বাইরে থেকে বাড়ির দিকে ফেরার সময় গাড়ির পেছনের কাচ লক্ষ্য করে ইট ছোড়া হয়।
অন্যদিকে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমির হামজা সম্প্রতি গণঅধিকার পরিষদ ও বিএনপিকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। এর প্রতিবাদেই গণঅধিকার পরিষদ সেখানে সমাবেশ করছিল। জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপির ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
আমির হামজা আহত হননি
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির হোসেন মাতুব্বর জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলেই ছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আমির হামজা বর্তমানে নিজ বাড়িতে আছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আমির হামজার বাড়িতে গিয়ে তাঁর গাড়িটি гараজে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন। এ সময় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জনকে লাঠি হাতে দেখা যায়।
আমির হামজার গণমাধ্যমকর্মী তানভীর হোসেন দাবি করেন, বাড়ি ফেরার সময় গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা গাড়িতে ইট ছোড়েন। তাঁর নিজের পায়েও ইটের আঘাত লাগে বলে জানান তিনি।
গণঅধিকার পরিষদের কার্যালয়েও হামলার অভিযোগ
গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে কুষ্টিয়া শহরের হাইস্কুল বাজারে গণঅধিকার পরিষদের জেলা কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আমির হামজার সমর্থকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে ওই কার্যালয়ে হামলা চালান। পরে তাঁরা মিছিল নিয়ে ছয়রাস্তা মোড়ের কাছে হরিপুর লিংক সেতু এলাকায় যান এবং সেখানে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ব্যক্তিগত কার্যালয়েও ভাঙচুর করেন।
এ সময় ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের সঙ্গেও হামলাকারীদের উত্তেজনা তৈরি হয় এবং ওই এলাকায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণঅধিকার পরিষদের জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদ বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে ফেরার পথে আমির হামজার সমর্থকেরা তাঁদের ওপর আকস্মিক হামলা চালান। এতে কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হন।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন জানান, তিনজন রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে এসেছিলেন। প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর তাঁরা চলে যান। তাঁদের শরীরে ইটের আঘাতে হওয়া সামান্য কাটা ও আঁচড়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
আহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন দাবি
গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, জামায়াতের নেতা-কর্মীরা তাঁদের মিছিলে হামলা করেছেন এবং এতে ৪০ থেকে ৫০ জন নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় তিনজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন এবং তাঁদের আঘাত গুরুতর ছিল না।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া শহরে কিছু সময়ের জন্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় মামলা করার কথা জানানো হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এমপির গাড়িতে হামলা ও পরবর্তী সময়ে দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় আমির হামজার গাড়িতে হামলা ও গণঅধিকার পরিষদের কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















