আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পর আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর একটি হলো—একটি রাষ্ট্র কীভাবে একই সঙ্গে কোনো শাসনব্যবস্থাকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে, আবার সেই শাসনের সঙ্গেই কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করে? রাশিয়ার সাম্প্রতিক আফগান নীতি এই প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
মস্কো ও কাবুলের মধ্যে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সহযোগিতা গত কয়েক বছরে দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। রাশিয়া তালেবান সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার পথ খুঁজছে। কিন্তু এই সম্পর্ক যত গভীর হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব। কারণ রাশিয়ার নিজস্ব নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কূটনৈতিক মহল বারবার আফগানিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রপন্থা, মাদক পাচার এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে।
এই দ্বৈত অবস্থানের ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে প্রথমে আফগানিস্তানের বাস্তবতা বুঝতে হবে। দীর্ঘ যুদ্ধ, দুর্বল অর্থনীতি এবং সীমিত রাষ্ট্রিক সক্ষমতার কারণে দেশটি এখনও গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য, উচ্চ বেকারত্ব এবং ব্যাপক দারিদ্র্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো নতুন সদস্য সংগ্রহের সুযোগ পায়। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আফগান অর্থনীতি এখনও স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে ফিরতে পারেনি।
![]()
এই পরিস্থিতি শুধু সামাজিক বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি নিরাপত্তা সমস্যাও। বহু আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে আফগান ভূখণ্ডে বিভিন্ন সশস্ত্র উগ্রবাদী সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। তাদের কেউ কেউ স্থানীয় প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত, আবার কেউ আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ফলে আফগানিস্তান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, বরং বৃহত্তর ইউরেশীয় নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেরিয়েবল হয়ে উঠেছে।
মস্কোর বক্তব্যও এই উদ্বেগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রুশ কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে আফগানিস্তান থেকে মধ্য এশিয়া, ককেশাস এবং অন্যান্য অঞ্চলে উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মূল্যায়নে বিদেশি যোদ্ধাদের উপস্থিতি, আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক এবং নতুন নিয়োগ কার্যক্রম এখনও উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। অর্থাৎ রাশিয়ার নিজস্ব নিরাপত্তা বিশ্লেষণ আফগানিস্তানকে এমন একটি ভূখণ্ড হিসেবে তুলে ধরে যেখানে সন্ত্রাসবাদের অবকাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
এখানেই রাশিয়ার নীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি উঠে আসে। যদি আফগানিস্তান সত্যিই এত বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হয়, তাহলে তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর যৌক্তিকতা কী?
একটি ব্যাখ্যা হলো বাস্তববাদী কূটনীতি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, রাষ্ট্রগুলো আদর্শগত পছন্দের ভিত্তিতে নয়, বরং নিরাপত্তা ও স্বার্থের ভিত্তিতে অংশীদার নির্বাচন করে। রাশিয়ার জন্য আফগানিস্তানকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা, মাদক পাচার এবং জঙ্গি নেটওয়ার্ক—সবকিছুই সরাসরি রুশ স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই তালেবানকে বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতির ওপর কিছুটা প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা মস্কোর কাছে অধিক কার্যকর বলে মনে হতে পারে।
আরেকটি কারণ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। আফগানিস্তান এমন একটি ভূখণ্ড যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে জড়িত। রাশিয়া সম্ভবত চায় না যে কাবুল সম্পূর্ণভাবে অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বলয়ে চলে যাক। তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা সেই প্রতিযোগিতামূলক কূটনীতিরও অংশ।

তবে এসব যুক্তি মূল সমস্যাকে দূর করে না। কারণ সম্পর্ক যতই কৌশলগত হোক, নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রশ্নটি থেকে যায়। কোনো রাষ্ট্র যদি এমন একটি সরকারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ায় যার নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে বহু উগ্রবাদী সংগঠনের উপস্থিতি নিয়ে নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়, তাহলে জবাবদিহি, তদারকি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
বিশেষত অস্ত্র, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে এই উদ্বেগ আরও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস দেখিয়েছে যে দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বা পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় সামরিক সম্পদকে অপ্রত্যাশিত হাতে পৌঁছে দিতে পারে। ফলে যে সহযোগিতা আজ স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে শুরু হয়, তা ভবিষ্যতে নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সহিংসতা, জঙ্গি কার্যক্রম এবং আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ নিয়ে ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে উদ্বিগ্ন। একইভাবে তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান এবং অন্যান্য মধ্য এশীয় দেশও আফগান পরিস্থিতিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে মনে করে। চীনও তার পশ্চিমাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে।
ফলে রাশিয়ার তালেবান নীতি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি পরীক্ষা। মস্কো মনে করছে, সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রভাব অর্জন করা সম্ভব। সমালোচকেরা বলছেন, এতে এমন একটি ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যার অধীনে নিরাপত্তা উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তালেবানকে নিয়ে নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি পুরোনো দ্বিধাকে নিয়ে। কোনো রাষ্ট্র কি নিরাপত্তা ঝুঁকিকে স্বীকার করেও সেই ঝুঁকির উৎসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে? এবং সেই সম্পর্ক কি শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি কমাবে, নাকি আরও জটিল করবে?
রাশিয়া এখন সেই প্রশ্নের বাস্তব পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। যদি এই সম্পৃক্ততা আফগান ভূখণ্ডে সক্রিয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে মস্কো তার নীতিকে সফল বলতে পারবে। কিন্তু যদি পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন না আসে, তাহলে রাশিয়া এমন এক অবস্থায় পড়তে পারে যেখানে সে একই সঙ্গে একটি সরকারকে শক্তিশালী করছে এবং সেই পরিবেশ থেকেই উদ্ভূত নিরাপত্তা হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
ইউরেশিয়ার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করবে এই হিসাব শেষ পর্যন্ত কতটা সঠিক প্রমাণিত হয় তার ওপর।
লেখক: আমির জাহাঙ্গীর, জননীতি বিশ্লেষক এবং পাকিস্তানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের কান্ট্রি পার্টনার ইনস্টিটিউটের প্রধান।




















