মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সাধারণত তেলের দাম, জ্বালানি সংকট কিংবা খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কথাই সামনে আসে। কিন্তু বর্তমান সংকটের আরও একটি গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী মাত্রা রয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। সেটি হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণব্যবস্থার ওপর যুদ্ধের অভিঘাত। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা যে শুধু মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে তা নয়; এটি অনেক দেশের জন্য ঋণসংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
গত এক দশকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই পরিস্থিতির ভিত্তি তৈরি করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে সুদের হার নিম্নমুখী থাকায় অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করে। অনেক ক্ষেত্রে সেই অর্থ অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হয়েছিল। ফলে ঋণ গ্রহণকে তখন উন্নয়নের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি স্থির থাকেনি। মহামারির পরপরই সুদের হার বেড়েছে, ডলারের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বৈশ্বিক আর্থিক পরিবেশ কঠোর হয়েছে। যে ঋণ একসময় তুলনামূলকভাবে সস্তা ছিল, তা এখন অনেক দেশের জন্য ক্রমবর্ধমান বোঝায় পরিণত হয়েছে। ঋণের মূল অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি সুদ পরিশোধের ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে, ফলে জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঋণের বোঝা এখন কেবল আর্থিক পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি সরাসরি উন্নয়ন নীতিকে প্রভাবিত করছে। বহু দেশকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ব্যয় সীমিত করতে হচ্ছে, যাতে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করা যায়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক সক্ষমতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ঋণ ঝুঁকি কমানোর জন্য অনেক দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজস্ব মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার দিকে ঝুঁকেছে। এতে বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি কিছুটা কমলেও নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। দেশীয় বাজারে উচ্চ সুদের হার সেই ঋণকেও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা বা স্থানীয় মুদ্রা—উভয় ক্ষেত্রেই অর্থায়নের খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে। তেলের দাম বৃদ্ধি মানে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বাজেট ঘাটতির বিস্তার। এসব কারণ শেষ পর্যন্ত ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থ সংগ্রহকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে।
তবে বর্তমান সংকটকে কেবল সাময়িক যুদ্ধজনিত সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বৈশ্বিক ঋণব্যবস্থার কাঠামোও পরিবর্তিত হয়েছে। ঋণদাতাদের প্রকৃতি বদলেছে, দ্বিপক্ষীয় ঋণের পরিশোধের সময়সীমা ঘনিয়ে এসেছে এবং বিভিন্ন ধরনের ঋণের মধ্যে সমন্বয় জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক দেশকে একই সময়ে একাধিক আর্থিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি এবং ঋণ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে যেসব দেশ ইতোমধ্যে ঋণচাপে বিপর্যস্ত, তাদের জন্য দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলবে।
একই সঙ্গে ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন ধারণাগুলোর গুরুত্বও বাড়ছে। জলবায়ু বিনিয়োগের সঙ্গে ঋণ পুনঃঅর্থায়নকে যুক্ত করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঋণ পরিশোধ সাময়িক স্থগিত রাখার সুযোগ সৃষ্টি করা কিংবা ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে এগুলো এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে এবং বর্তমান সংকটের ব্যাপকতা মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বিশ্ব কি আবারও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত? মহামারির সময় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বহু দেশকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। আজকের পরিস্থিতিও তেমনই একটি সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া দাবি করে। কারণ যে দেশগুলো আজ ঋণের চাপে জর্জরিত, তাদের অধিকাংশই বর্তমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতের জন্য দায়ী নয়। তবু সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা তাদের কাঁধেই এসে পড়েছে।
অর্থনৈতিক ইতিহাস দেখায়, ঋণসংকটকে দীর্ঘদিন অমীমাংসিত রেখে দিলে তার মূল্য আরও বেশি দিতে হয়। তাই এখন প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং এমন একটি আর্থিক কাঠামো, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুধু ঋণ পরিশোধের যন্ত্রে পরিণত না করে টেকসই উন্নয়নের সুযোগও নিশ্চিত করবে। বর্তমান যুদ্ধ হয়তো আঞ্চলিক, কিন্তু এর আর্থিক অভিঘাত নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক। আর সেই অভিঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বৈশ্বিক দক্ষিণের কোটি কোটি মানুষ।
মুসা ফাকি মাহামাত 



















