বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে দুই দেশের বিশিষ্ট গবেষক, কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকেরা বলেছেন, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস অর্ধশতাব্দীর হলেও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও উন্নয়নের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক আগামী ৫০ বছরে আরও বিস্তৃত সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
শুক্রবার রাজধানীর বারিধারায় কসমস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কসমস ডায়ালগে ‘৫০ ইয়ার্স অব বাংলাদেশ-চায়না রিলেশনস: অ্যাচিভমেন্টস, চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড প্রসপেক্টস’ শীর্ষক বইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা ইতিহাসের আলোকে ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্পর্কের ভিত্তি আস্থা ও উন্নয়ন
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শতাব্দীপ্রাচীন বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক বন্ধনই আজকের কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তি তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট গবেষক ও কসমস ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান সর্বকালীন বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারত্ব আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, অশুল্ক বাধা দূর করা এবং দক্ষতা স্থানান্তর, সুশাসন ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা
কসমস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এনায়েতুল্লাহ খান বলেন, এই সুবর্ণজয়ন্তী শুধু অতীত মূল্যায়নের সুযোগ নয়, বরং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বাণিজ্যের বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত সহযোগিতা সম্প্রসারণেরও সুযোগ তৈরি করেছে।
বক্তারা স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ১০০ কোটি ডলার। বর্তমানে তা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই অগ্রগতি দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
তারা বলেন, চলতি মাসে প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের নির্ধারিত চীন সফরের সময় নতুন বিনিয়োগ চুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তিস্তা ও মোংলা ঘিরে আলোচনা
সেমিনারে বক্তারা মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প এবং সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনার কথা তুলে ধরেন। এসব উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও গভীর করবে বলে তারা মনে করেন।

গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময়ের গুরুত্ব
নবপ্রকাশিত বইটিতে বাংলাদেশ ও চীনের ১৮ জন গবেষকের যৌথ কাজ স্থান পেয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ প্রবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ শিল্পখাতসহ বিভিন্ন বিষয় এতে আলোচিত হয়েছে।
সহ-সম্পাদক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বইটি শুধু অতীত ও বর্তমান সম্পর্কের বিশ্লেষণ নয়, ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের সম্ভাবনাও তুলে ধরেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষাবিদদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
ভবিষ্যতের পথে ইতিহাসের শিক্ষা
সাংহাই একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক ওয়াং ঝেন বলেন, গত ৫০ বছরে দুই দেশ অত্যন্ত ইতিবাচক সম্পর্ক উপভোগ করেছে এবং আগামী ৫০ বছরেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও কার্যকর সহযোগিতার পথ খুঁজে বের করা সম্ভব।
সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক করিম বলেন, বিশ্বব্যবস্থায় নতুন কাঠামো গড়ে উঠছে এবং সেখানে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশেরও নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হবে। দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভবিষ্যতের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
অধ্যাপক আমেনা মহসীন বলেন, বইটি কেবল অতীত ও বর্তমানের মূল্যায়ন নয়, ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরেছে। তিনি সৃজনশীল ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন নাগরিক গঠনে শিক্ষার ভূমিকার ওপর জোর দেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















