জাপানের বিভিন্ন উচ্চাভিলাষী নগর উন্নয়ন প্রকল্প এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নির্মাণ ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং কঠোর কর্মঘণ্টা নীতির কারণে বহু প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে পরিকল্পনাই পরিবর্তন করতে হচ্ছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ পুনর্গঠন প্রকল্প শিবুয়া উন্নয়ন কর্মসূচিও নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে শেষ হওয়ার পথে। এ পরিস্থিতিতে ডেভেলপারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা এবং সতর্কতার প্রবণতা।
শিবুয়ার উন্নয়ন শেষ হতে আরও সময়
টোকিওর ব্যস্ত শিবুয়া এলাকা দীর্ঘদিন ধরে একটি বৃহৎ পুনর্গঠন প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে শুরু হওয়া এই পরিকল্পনা মূলত ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নানা জটিলতা ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের সমাপ্তি এখন ২০৩৫ সালে গিয়ে ঠেকেছে।
ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি নতুন স্থাপনা চালু হলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবকাঠামোর কাজ এখনও বাকি রয়েছে। শিবুয়া কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি শুধু আধুনিকায়ন নয়, বরং বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানুষের চলাচল আরও নিরাপদ ও সহজ করার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্মাণসামগ্রীর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অ্যালুমিনিয়াম, কাচ ও ইস্পাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের মূল্য কয়েক বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে শ্রমিক ব্যয়ও প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি। নতুন কর্মঘণ্টা নীতির ফলে নির্মাণ খাতে অতিরিক্ত সময় কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশজুড়ে প্রকল্পে ‘অপেক্ষা ও দেখো’ পরিস্থিতি
জাপানের বিভিন্ন শহরে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প বিলম্বিত হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ডেভেলপারদের একটি বড় অংশ তাদের পরিকল্পনা সংশোধন বা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। অনেক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে, ফলে নতুন করে নকশা তৈরি বা কাজ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগর উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি এবং কঠোর আর্থিক জবাবদিহিতার মধ্যে পরিচালিত হয়। তাই ব্যয় বেড়ে গেলে ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ অনেক কমে যায়।
গিফু থেকে সাপ্পোরো, সর্বত্র একই চিত্র
গিফু শহরে পরিকল্পিত দুটি উঁচু টাওয়ারের প্রকল্প নতুন করে নকশা করতে হয়েছে। ফুকুশিমায় একটি বড় প্রকল্পের নির্মাণ এখনও শুরু হয়নি, যদিও পুরোনো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছিল কয়েক বছর আগে।
নাগোয়া, সাপ্পোরো এবং ফুকুওকার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কোথাও ভবনের উচ্চতা কমানোর চিন্তা চলছে, কোথাও প্রকল্পের সময়সীমা কয়েক বছর বাড়ানো হয়েছে। আবার কিছু প্রকল্প পুরোপুরি বাতিলও করা হয়েছে কারণ ব্যয়ের হিসাব দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
টোকিও ও ওসাকাও রক্ষা পাচ্ছে না
জাপানের বৃহত্তম মহানগরীগুলোও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। টোকিওর একটি ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে।
ওসাকাতেও একটি ঐতিহ্যবাহী ভবনের আধুনিকায়ন প্রকল্প এখনও শুরু করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে কয়েকটি বিলাসবহুল হোটেল পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনাও অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সমাধান খুঁজতে একসঙ্গে শিল্পখাত
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার এবং নির্মাণ খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা যৌথ বৈঠকে বসেছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উভয় পক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিক সংকট মোকাবিলা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ না করা গেলে জাপানের নগর উন্নয়নের গতি আরও ধীর হয়ে পড়তে পারে।












