একসময় যন্ত্রমানব বা রোবট প্রযুক্তির কথা উঠলেই বিশ্বের নজর যেত জাপানের দিকে। দুই পায়ে হাঁটা, বস্তু ধরতে পারা কিংবা পিয়ানো বাজানো রোবট তৈরি করে জাপান প্রযুক্তি বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসে সেই নেতৃত্ব এখন অনেকটাই চীনের হাতে চলে গেছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রোবট এবং মানবসদৃশ যন্ত্রমানব তৈরির ক্ষেত্রে চীন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে তাদের ছাড়া রোবট তৈরি করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।
চীনের হাতে সরবরাহ শৃঙ্খলের নিয়ন্ত্রণ
রোবট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সেন্সর, জয়েন্ট, মোটর, কাঠামোগত অংশসহ নানা উপাদানের বড় অংশ এখন চীনে তৈরি হচ্ছে। আগে এসব যন্ত্রাংশের জন্য জাপান ও অন্যান্য দেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
ফলে বর্তমানে রোবট শিল্পের প্রায় পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলই চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনে যন্ত্রাংশের উৎপাদন খরচ এত দ্রুত কমেছে যে অন্য দেশগুলোর পক্ষে সেই দামে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

কারখানার রোবট ব্যবহারে বিশ্বে শীর্ষে
শিল্প উৎপাদনে ব্যবহৃত রোবট স্থাপনের ক্ষেত্রেও চীন এখন অনেক এগিয়ে। ২০২৪ সালে দেশটির কারখানাগুলোতে ২০ লাখের বেশি রোবট কাজ করেছে। একই বছরে নতুন করে আরও প্রায় ৩ লাখ রোবট স্থাপন করা হয়েছে, যা বিশ্বের বাকি সব দেশের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি।
অন্যদিকে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির মতো বড় বাজারগুলোতে শিল্প রোবট স্থাপনের হার কমেছে। ফলে উৎপাদনশীল শিল্পে রোবট ব্যবহারের ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পই বদলে দিয়েছে চিত্র
রোবট শিল্পে চীনের উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্প। দীর্ঘদিনের সরকারি বিনিয়োগ এবং স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ তৈরির কৌশলের কারণে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।
যেসব প্রতিষ্ঠান আগে গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরি করত, তাদের অনেকেই এখন রোবট শিল্পে সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে। ফলে একই অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্রুত এবং কম খরচে রোবট উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
চীনের বড় প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলোতে এখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোবটের প্রয়োজনীয় অংশ সংগ্রহ করা যায়। অনেক যন্ত্রাংশ তাৎক্ষণিকভাবে ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ প্রযুক্তিতে তৈরি করা হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের নতুন আকর্ষণ
মানবসদৃশ রোবটকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে চীনে বিপুল বিনিয়োগ আসছে। ২০২৫ সালে যন্ত্রমানবভিত্তিক নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে, যা আগের পাঁচ বছরের মোট বিনিয়োগের সমান।
এ বছরও বিনিয়োগের গতি আরও বেড়েছে। বহু প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করছেন, ভবিষ্যতে বিপজ্জনক কাজ, ভারী মাল বহন এবং শিল্প পর্যবেক্ষণের মতো কাজে মানবসদৃশ রোবট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ
তবে সব সাফল্যের মধ্যেও বাস্তবতা হলো, বর্তমানের মানবসদৃশ রোবটগুলো এখনও মানুষের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচ বা কসরত দেখানো রোবটগুলো মূলত পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ করে কাজ করে।

পরিবর্তনশীল পরিবেশে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, জটিল পরিস্থিতি বোঝা এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে এখনও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক রোবট গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরীক্ষামূলক প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
চীনের কিছু বৈদ্যুতিক গাড়ি কারখানায় রোবট দিয়ে বাক্স বহন বা সাধারণ শ্রমের কাজ করানো হচ্ছে। তবে এসব রোবটের উৎপাদন দক্ষতা এখনও মানুষের তুলনায় অনেক কম। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবধান কমাতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
ভবিষ্যতের দৌড়ে এগিয়ে চীন
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট প্রযুক্তি নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহ শৃঙ্খল, কম খরচ এবং বিপুল বিনিয়োগের কারণে চীন এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে রোবট শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হলে দেশটির নাম এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
যদিও মানবসদৃশ রোবট এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবু প্রযুক্তির এই দৌড়ে চীন যে সবচেয়ে বড় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তা নিয়ে সংশয় খুব কম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















