রাশিয়া ও পাকিস্তানের সম্পর্ককে কেবল উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, আনুষ্ঠানিক বিবৃতি কিংবা সাময়িক কূটনৈতিক উষ্ণতার মধ্য দিয়ে বিচার করলে এর প্রকৃত গতিপথ বোঝা কঠিন। গত কয়েক বছরে দুই দেশ এমন এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যার মূল শক্তি প্রচার নয়, বরং ধারাবাহিক যোগাযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বাস্তব স্বার্থের সমন্বয়। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নিরাপত্তা সহযোগিতায় আফগানিস্তানই কেন্দ্র
রাশিয়া-পাকিস্তান সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এখন নিরাপত্তা। বিশেষ করে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার প্রয়োজন তৈরি করেছে। জুনে ইসলামাবাদে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দুই দেশের যৌথ কর্মদলের ১২তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আফগানিস্তান থেকে উদ্ভূত আঞ্চলিক সন্ত্রাসের ঝুঁকি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের গুরুত্ব কোনো এক দিনের বৈঠকের চেয়ে অনেক বেশি। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে এমন বৈঠক হওয়া দেখায় যে সম্পর্কটি ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে ধীরে ধীরে একটি কাঠামোর ওপর দাঁড়াচ্ছে। সরকার পরিবর্তন বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওঠানামা হলেও যোগাযোগের চ্যানেলগুলো সচল রাখাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ইসলামাবাদের দৃষ্টিতে আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বড় উদ্বেগের বিষয়। পাকিস্তান তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান ও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির মতো সংগঠনকে এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে মস্কোর প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে ইসলামিক স্টেট-খোরাসান, যার কর্মকাণ্ড আফগানিস্তানের সীমা ছাড়িয়ে রাশিয়াকেও লক্ষ্য করেছে।
দুই দেশের উদ্বেগ এক নয়, কিন্তু সমস্যার একটি জায়গায় তাদের অবস্থান কাছাকাছি—আফগানিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে নয়, বরং বাস্তব যোগাযোগের মাধ্যমে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
তালেবান প্রশ্নে মস্কোর বাস্তববাদ
আফগানিস্তান নিয়ে রাশিয়ার অবস্থানের পরিবর্তন এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০২৫ সালে মস্কো তালেবানকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা থেকে সরিয়ে দেয় এবং পরে তালেবান প্রশাসনকে আফগানিস্তানের সরকার হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশ হয়। ২০২৬ সালের শুরুতে মস্কোতে তালেবান সরকারের রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই অবস্থান আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে ইতিহাসের বড় বৈপরীত্য রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন একসময় আফগানিস্তানে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়েছিল। অথচ কয়েক দশক পর রাশিয়া একই ভূখণ্ডে তালেবান প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার পথ বেছে নিয়েছে।
এর কারণ আদর্শগত ঘনিষ্ঠতা নয়; বরং নিরাপত্তা ও বাস্তব স্বার্থ। সন্ত্রাসবাদ ও মাদক পাচার মোকাবিলা যেমন রাশিয়ার উদ্বেগ, তেমনি জ্বালানি, পরিবহন, কৃষি ও অবকাঠামোতেও মস্কোর আগ্রহ রয়েছে। পাকিস্তানের জন্যও আফগানিস্তানকে ঘিরে রাশিয়ার সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ভবিষ্যৎ অনেকটাই আফগান পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ সেতু
রাশিয়া-পাকিস্তান সম্পর্ককে শুধু দ্বিপক্ষীয় কাঠামোয় দেখলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়ে যায়—সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা। পাকিস্তান ২০১৭ সালে এই সংগঠনের পূর্ণ সদস্য হওয়ার পর মস্কোর সঙ্গে বহুপক্ষীয় পরিসরে নিয়মিত যোগাযোগের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে।
সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার, অনিরাপদ সীমান্ত এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মতো সমস্যাগুলো কোনো এক দেশের পক্ষে এককভাবে মোকাবিলা করা কঠিন। এই বাস্তবতা রাশিয়া ও পাকিস্তানকে একই টেবিলে বসার যথেষ্ট কারণ দেয়।
২০২৬ সালের আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলন কিরগিজস্তানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এরপর সংগঠনটির সভাপতিত্ব পাকিস্তানের হাতে যাবে। ইসলামাবাদ এই মেয়াদে অর্থনৈতিক যোগাযোগ, আঞ্চলিক সংযোগ এবং নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ২০২৭ সালে ইসলামাবাদে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতিও পাকিস্তানকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে আরও দৃশ্যমান ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ দেবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে অগ্রগতি হলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাশিয়া-পাকিস্তান সম্পর্ক এখনো সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে। দুই দেশও বিষয়টি স্বীকার করছে। জুনে তারা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি কর্মসূচি তৈরির বিষয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। লক্ষ্য হচ্ছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক বাধা কমানো।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে যোগাযোগব্যবস্থা। পাকিস্তান রাশিয়ার আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডরে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই স্থল, রেল ও সমুদ্রভিত্তিক নেটওয়ার্ক রাশিয়াকে ভারত, ইরান, আজারবাইজান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে। পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্কের একটি সংযোগস্থল হতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগ সফল হলে রাশিয়া-পাকিস্তান সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৃহত্তর ইউরেশীয় বাণিজ্য ও পরিবহন কাঠামোর অংশ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এটি পাকিস্তানের বিদ্যমান চীনকেন্দ্রিক অবকাঠামো উদ্যোগের বিকল্প না হয়ে পরিপূরক একটি পথ তৈরি করতে পারে।

ধীর অগ্রগতিই হয়তো সবচেয়ে টেকসই
রাশিয়া ও পাকিস্তানের সম্পর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর গতি। এখানে বড় কোনো আকস্মিক জোটের ঘোষণা নেই, নেই নাটকীয় কৌশলগত পরিবর্তন। বরং একের পর এক বৈঠক, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য চুক্তি, পরিবহন পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পর্কটি গভীর হচ্ছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষর করা তুলনামূলকভাবে সহজ; কঠিন হলো সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করা। রাশিয়া ও পাকিস্তানের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জও সেটিই। জ্বালানি, বাণিজ্য, অর্থপ্রদান ব্যবস্থা, পরিবহন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি না হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে রূপ নেবে না।
তবু গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—মস্কো ও ইসলামাবাদ তাদের সম্পর্ককে আর কেবল অতীতের ইতিহাস দিয়ে সংজ্ঞায়িত করতে চাইছে না। নিরাপত্তা থেকে বাণিজ্য, আফগানিস্তান থেকে আঞ্চলিক যোগাযোগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রের বাস্তব প্রয়োজন তাদের কাছাকাছি নিয়ে আসছে।
এই সম্পর্কের সাফল্য শেষ পর্যন্ত কতগুলো সমঝোতা স্মারক বা নেতাদের বৈঠকের সংখ্যায় মাপা যাবে না। বরং নির্ধারিত প্রকল্প বাস্তবায়ন, বাণিজ্য বৃদ্ধির সক্ষমতা, নিরাপত্তা সহযোগিতার কার্যকারিতা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ কতটা বাড়ে—সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শিরোনাম তৈরি করে আসে না। অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিবর্তন তৈরি হয় নিয়মিত বৈঠক, ধৈর্যশীল আলোচনা এবং ছোট ছোট বাস্তব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। রাশিয়া ও পাকিস্তানের বর্তমান সম্পর্ক সেই নীরব পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ।
লেখক: ফাতিমা শেখ, রাশিয়ায় পাকিস্তান দূতাবাসের কাউন্সেলর।
ফাতিমা শেখ 


















