হলিউডের খ্যাতিমান পরিচালক ও অভিনেতা রব রেইনার এবং তাঁর স্ত্রী মিশেল সিঙ্গার রেইনার হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড় এসেছে। তাঁদের ছেলে নিক রেইনারের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বাবা-মাকে হামলার আগে তিনি তাঁদের জন্য ওত পেতে অপেক্ষা করছিলেন। অভিযোগটি হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির গ্র্যান্ড জুরি নিকের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ অনুমোদন করেছে। গত ২০ জুলাই গোপনে এই অভিযোগপত্র অনুমোদন করা হলেও বুধবার তা প্রকাশ্যে আসে। আদালতে নিক অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর লস অ্যাঞ্জেলেসের অভিজাত ব্রেন্টউড এলাকায় নিজেদের বাড়িতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন রব রেইনার ও মিশেল রেইনার। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের ৩২ বছর বয়সী ছেলে নিককে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই দিন পর তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
‘ওত পেতে থাকা’ অভিযোগের গুরুত্ব
নতুন অভিযোগপত্রে হত্যার পাশাপাশি ‘ওত পেতে থাকা’র বিশেষ অভিযোগ যুক্ত করা হয়েছে। আইনগতভাবে এর অর্থ হলো, হামলার শিকার ব্যক্তিদের আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে আগে থেকেই অপেক্ষা করা বা নিজেকে আড়ালে রাখা।

এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে হত্যাকাণ্ডে পূর্বপরিকল্পনার বিষয়টি আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে হত্যার দায় প্রমাণিত হলে নিকের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে প্রসিকিউটররা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
অভিযোগপত্রে ছুরি ব্যবহারের বিষয়টিও বিশেষ অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নতুন নথিতে হত্যার পেছনে নিকের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য কী ছিল, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
গোপনীয়তায় ঢাকা তদন্ত
এই মামলার শুরু থেকেই তদন্তের অনেক তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। নিক কেন তাঁর বাবা-মাকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে প্রসিকিউটররাও প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য ফাঁসের ঘটনাও খুব কম।
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির প্রধান চিকিৎসা পরীক্ষক জানিয়েছেন, তিনি রব ও মিশেলের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে চান। কিন্তু আদালতের নির্দেশের কারণে তা এখনো প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
নতুন অভিযোগপত্র প্রকাশ পেলেও হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগে কী ঘটেছিল বা নিক কীভাবে হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তেমন নতুন তথ্য সামনে আসেনি।
বিচারপ্রক্রিয়ায় নতুন ধাপ
গ্র্যান্ড জুরির মাধ্যমে অভিযোগপত্র অনুমোদনের ফলে প্রসিকিউটররা মামলাটিকে সরাসরি বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে নিতে পারবেন। সাধারণভাবে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রাথমিক শুনানিতে প্রকাশ্যে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় এবং একজন বিচারক সিদ্ধান্ত নেন মামলাটি বিচারের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী কি না।
কিন্তু গ্র্যান্ড জুরির প্রক্রিয়াটি গোপনে সম্পন্ন হয়। নিকের মামলাতেও সেই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকাশ্য প্রাথমিক শুনানির ধাপ এড়িয়ে মামলাটি বিচারের দিকে এগোতে পারছে।

প্রতিরক্ষার খরচ নিয়ে নতুন আইনি লড়াই
এর মধ্যেই নিজের আইনি লড়াই চালানোর জন্য বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া ট্রাস্টের অর্থ পাওয়ার চেষ্টা করছেন নিক। আদালতে দেওয়া আবেদনে তিনি দাবি করেছেন, ট্রাস্টের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কোনো আইনগত কারণ ছাড়াই তাঁকে সেই অর্থ দিচ্ছেন না।
আইনি নথি অনুযায়ী, বাবা-মা জীবিত থাকলেও ওই অর্থ নিকের পাওয়ার কথা ছিল। তাঁর আবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাস্টে অন্তত ১৫ লাখ ডলারের সম্পদ রয়েছে।
নিক তাঁর পক্ষে আবারও খ্যাতিমান আইনজীবী অ্যালান জ্যাকসনকে নিয়োগ করতে চান। শুরুতে জ্যাকসন তাঁর হয়ে আইনি লড়াই করেছিলেন। পরে নিকের ভাইবোনেরা তাঁর আইনজীবীর খরচ বহন করতে রাজি না হওয়ায় সরকারি আইনজীবী তাঁর দায়িত্ব নেন।
এই অর্থসংক্রান্ত আবেদনের শুনানি আগামী সপ্তাহে হওয়ার কথা।
রব রেইনারের দীর্ঘ হলিউড ক্যারিয়ার
রব রেইনার ছিলেন হলিউডের অন্যতম পরিচিত অভিনেতা ও পরিচালক। টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘অল ইন দ্য ফ্যামিলি’-তে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান এবং দুটি এমি পুরস্কার অর্জন করেন।
পরিচালক হিসেবেও তাঁর সাফল্য ছিল অসাধারণ। ‘দিস ইজ স্পাইনাল ট্যাপ’, ‘স্ট্যান্ড বাই মি’, ‘আ ফিউ গুড মেন’ এবং ‘হোয়েন হ্যারি মেট স্যালি’সহ বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তাঁর পরিচালনায় নির্মিত হয়।

মিশেল সিঙ্গার রেইনার ছিলেন আলোকচিত্রী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক। ‘হোয়েন হ্যারি মেট স্যালি’ চলচ্চিত্রের কাজের সময় রবের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তাঁরা বিয়ে করেন এবং ৩৬ বছর একসঙ্গে ছিলেন।
তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে নিক ছিলেন দ্বিতীয়। বাবা-ছেলে একসঙ্গে ২০১৫ সালের চলচ্চিত্র ‘বিইং চার্লি’র চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। ছবিটিতে নিকের কৈশোরের আসক্তি ও গৃহহীনতার অভিজ্ঞতার কিছু অংশ উঠে এসেছিল।
রব ও মিশেলের মৃত্যুর পর তাঁদের বড় ছেলে জেক রেইনার এই ঘটনাকে নিজের জীবনের ‘বুঝে ওঠার বাইরে এক দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এখন নিকের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় বহুল আলোচিত এই মামলাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রব ও মিশেল রেইনার হত্যাকাণ্ডে নিক রেইনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন এবং মামলার পরবর্তী বিচারিক ধাপেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















