সৌদি আরবের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গঠিত জোটকে সমর্থনের কথা জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে জোটের কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী মোহসিন নাকভি সম্প্রতি ইরান সফর করে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সফরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের বার্তাও ইরানি নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দেন তিনি।
ইরান সফরে শান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি জানিয়েছেন, নাকভির সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং চলমান শান্তি প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ইরানি নেতৃত্বের কাছে ঠিক কী বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করেননি তিনি।
তিনি বলেন, পাকিস্তান সরাসরি ও পরোক্ষ—দুই ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে মতবিরোধ কমানো এবং গঠনমূলক আলোচনার পথ সচল রাখার চেষ্টা করছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংসদের স্পিকারকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে তাঁদের সফর হবে বলে আশা করছে ইসলামাবাদ।
হরমুজ প্রণালিতে সমঝোতার ওপর জোর
পাকিস্তান মনে করছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান অচলাবস্থার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জানান, বর্তমানে ওমান ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং কয়েকটি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ সেই উদ্যোগকে সমর্থন করছে। পাকিস্তানও এ প্রচেষ্টার পাশে রয়েছে।
তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি সমঝোতা হলে তা বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পথ খুলে দিতে পারে। সামগ্রিক শান্তি আলোচনা বর্তমানে স্থবির থাকলেও দ্রুত তা আবার শুরু হবে বলে আশা করছে পাকিস্তান।
সংঘাতের পর আলোচনাই স্বাভাবিক পথ
পাকিস্তান মনে করছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় ধরনের সংঘাতে উত্তেজনা ও আলোচনার মধ্যে এমন ওঠানামা স্বাভাবিক। সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে তীব্র উত্তেজনার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত পক্ষগুলো আলোচনায় ফিরে আসে।
এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই পাকিস্তান শান্তিপূর্ণ সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদী বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র।

হুথিদের হামলায় তিন পাকিস্তানি নিহত
এদিকে বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় তিন পাকিস্তানি নিহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজে এ ধরনের হামলা নিরপরাধ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এবং লোহিত সাগরে নৌযান চলাচল ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করে।
নিহত পাকিস্তানিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আহত পাকিস্তানি নাগরিককে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য রিয়াদে পাকিস্তানি দূতাবাসকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে সহায়তার ঘোষণা
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, বাব আল-মান্দাবের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব যে সামুদ্রিক জোটের উদ্যোগ নিয়েছে, পাকিস্তান সেই জোটের অংশীদার। আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ নৌ চলাচল ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার পক্ষে পাকিস্তানের অবস্থান স্পষ্ট।

বিশ্বের সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব ও জোটের অন্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে ইসলামাবাদ প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায় পাকিস্তান
এদিকে পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
সাক্ষাতে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় চলমান সহযোগিতা এবং সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের সফরের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
ইসহাক দার ইরানের সঙ্গে অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে পাকিস্তানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়েও দুই পক্ষ মতবিনিময় করে।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আবারও বলা হয়েছে, বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সংলাপ ও কূটনীতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















