ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল সরবরাহ। রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা—সবকিছু মিলিয়ে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে আরেকটি বড় ভূরাজনৈতিক সংকট ইউরোপের গ্যাস বাজারকে অচল করে দিতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রতিক সংকট সেই ধারণাকে নতুনভাবে যাচাই করার সুযোগ দিয়েছে। ফলাফল বলছে, ইউরোপের গ্যাস বাজার ভেঙে পড়েনি। বরং প্রকৃত চ্যালেঞ্জটি হয়তো সামনে অপেক্ষা করছে—গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত কমে যাওয়ার বাস্তবতায়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালিতে কার্যত পরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ঝুঁকির মুখে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপ ও এশিয়ায় গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। তবে বাজারের প্রতিক্রিয়া যতটা ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা ছিল, বাস্তবে তা হয়নি।
এর প্রধান কারণ ইউরোপ গত কয়েক বছরে তার জ্বালানি অবকাঠামোকে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় করেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়তি এলএনজি সরবরাহ, উত্তর আফ্রিকার উৎপাদকদের অবদান এবং নতুন টার্মিনাল ও আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থার কারণে সরবরাহ ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাজার বিভক্ত হয়নি, মূল্যবৃদ্ধিও তুলনামূলকভাবে সমান ছিল। অর্থাৎ সংকটের মধ্যেও ইউরোপীয় জ্বালানি বাজারের সংহতি অক্ষুণ্ন থেকেছে।
অবশ্য এই স্থিতিস্থাপকতার মূল্য ছিল না এমন নয়। রাশিয়া থেকে এলএনজি আমদানি কিছুটা বেড়েছে, যা ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য—মস্কোর জ্বালানি প্রভাব কমানো—এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবুও সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, সরবরাহ ব্যবস্থার অভিযোজন ক্ষমতা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন উঠে আসে: যদি এত বড় সরবরাহ-ধাক্কাও বাজারকে বিপর্যস্ত করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতের আসল ঝুঁকি কোথায়?
উত্তরটি চাহিদার ভেতরে লুকিয়ে আছে।
ইউরোপের জ্বালানি রূপান্তর এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে গ্যাসের ভবিষ্যৎ আর শুধু সরবরাহের ওপর নির্ভর করছে না। বরং নির্ভর করছে শিল্প, আবাসন ও বিদ্যুৎ খাত কত দ্রুত বিকল্প প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকবে তার ওপর। আগামী দশকে গ্যাসের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে—এমন সম্ভাবনা এখন আর কেবল পরিবেশবাদী কল্পনা নয়, বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ।
যদি বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম তুলনামূলক কম থাকে, তাহলেও ইউরোপে গ্যাসের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমবে। কারণ শক্তি দক্ষতা বৃদ্ধি, বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির প্রসার এবং শিল্পখাতে নতুন উৎপাদন পদ্ধতি গ্যাসের প্রয়োজন কমিয়ে দেবে। গ্যাস তখনও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষায়, কিন্তু আগের মতো সর্বব্যাপী জ্বালানি হিসেবে নয়।
আর যদি দাম বেশি থাকে—যা বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অসম্ভব নয়—তাহলে এই পরিবর্তন আরও দ্রুত ঘটবে। উচ্চমূল্য ভোক্তা ও শিল্প উভয়কেই বিকল্প জ্বালানির দিকে ঠেলে দেবে। নবায়নযোগ্য শক্তি, ব্যাটারি প্রযুক্তি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং বিদ্যুতায়িত তাপব্যবস্থা তখন গ্যাসের জায়গা ক্রমশ দখল করবে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি দিকও রয়েছে। ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাস থেকে বেরিয়ে এলেও সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে উঠবে না। বরং এলএনজির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে এশিয়ার দ্রুত বর্ধমান চাহিদা কাতারের মতো বড় রপ্তানিকারকদের পূর্বমুখী হতে উৎসাহিত করবে। ফলে ইউরোপের জন্য জ্বালানি সরবরাহের উৎস সংখ্যায় সীমিত হতে পারে, এমনকি সরবরাহের কাঠামো আরও একমুখীও হয়ে উঠতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক ভুল ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বহুদিন ধরে ইউরোপের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গ্যাসকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘সেতুবন্ধন জ্বালানি’ হিসেবে দেখা হয়েছে—যে জ্বালানি নবায়নযোগ্য শক্তির যুগে পৌঁছানোর আগে একটি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী অন্তর্বর্তী সমাধান দেবে। কিন্তু যদি এলএনজির দাম স্থায়ীভাবে উচ্চ পর্যায়ে থাকে এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়মিত ফিরে আসে, তাহলে সেই ধারণা আর টেকসই নাও থাকতে পারে।
হরমুজ সংকট তাই এক অর্থে আশাব্যঞ্জক খবর দিয়েছে। এটি দেখিয়েছে যে ইউরোপের গ্যাস বাজার আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি সত্যও সামনে এনেছে: ভবিষ্যতে ইউরোপের গ্যাস খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো সরবরাহের ধাক্কা নয়, বরং ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসা একটি বাজার।
গ্যাসের যুগ শেষ হয়ে যাবে—এমন কথা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে আগামী দশকগুলোতে এর ভূমিকা যে ক্রমশ ছোট হয়ে আসবে, সেই ইঙ্গিত দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ইউরোপের জ্বালানি কাহিনির শেষ অধ্যায় তাই কোনো আকস্মিক বিপর্যয়ের গল্প নাও হতে পারে; বরং হতে পারে দীর্ঘ, ধীর এবং অবশ্যম্ভাবী রূপান্তরের ইতিহাস।
মার্টিন ভ্লাদিমিরভ ও বোরবালা তোথ 



















