যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ছোট শহর বাস্ত্রপে গত কয়েক বছরে যে পরিবর্তনের ঢেউ বইছে, তা এবার আরও গতি পেতে যাচ্ছে। ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন স্পেসএক্সের ঐতিহাসিক শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির (আইপিও) পর শহরটির বহু বাসিন্দা এক ধাক্কায় আরও সম্পদশালী হয়ে উঠেছেন। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি, আবাসন বাজার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা দেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি স্পেসএক্স ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও সম্পন্ন করেছে। বাস্ত্রপ এলাকায় কোম্পানিটির প্রায় ১,৬০০ কর্মী কাজ করেন। জনসংখ্যা মাত্র ১৪ হাজারের এই শহরে কর্মীদের বড় একটি অংশ এখন উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধার মুখ দেখছেন।
আইপিওর প্রভাব ছড়াতে শুরু করেছে
স্থানীয় শিল্পগ্যালারি ফাউন্ড ফাইন আর্টের মালিক জেমি হাওয়ার্ডের মতে, তার অনেক গ্রাহক ইতোমধ্যে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা করছেন। কর্মীরা যখন নিজেদের শেয়ার নগদায়ন করতে পারবেন, তখন স্থানীয় অর্থনীতিতে তার প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে বলে তিনি মনে করেন।

আইপিও ঘোষণার পর স্পেসএক্স কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাসও ছিল চোখে পড়ার মতো। বাস্ত্রপের ‘এলন ল্যান্ড’ নামে পরিচিত এলাকায় কর্মীরা একত্রিত হয়ে উদযাপন করেছেন। কেউ বহুদিনের স্বপ্নের গাড়ি কেনার পরিকল্পনার কথা বলেছেন, কেউ আবার নতুন আর্থিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
‘এলন ল্যান্ড’-এর উত্থান
২০২১ সালে ইলন মাস্ক অস্টিনের কাছাকাছি বাস্ত্রপ ও ট্রাভিস কাউন্টিতে ব্যাপক জমি কেনা শুরু করেন। বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি এক হাজার একরেরও বেশি জমি অধিগ্রহণ করেন।
প্রথমে সেখানে বোরিং কোম্পানি কার্যক্রম শুরু করে। পরে স্পেসএক্সের স্টারলিংক ইউনিট উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করে। পরবর্তীতে এক্স (সাবেক টুইটার) এবং আবাসিক উন্নয়ন প্রকল্প যুক্ত হয়ে এলাকাটি একটি বড় করপোরেট কমপ্লেক্সে রূপ নেয়। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন ‘এলন ল্যান্ড’ নামেই পরিচিত।
বর্তমানে এই অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে স্পেসএক্সের ১১ লাখ বর্গফুটের বিশাল উৎপাদন কারখানা, যেখানে মহাকাশ প্রযুক্তির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি হয়।
জনসংখ্যা ও সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি

মাত্র কয়েক বছর আগেও বাস্ত্রপের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করত সাধারণ শিল্প ও স্থানীয় ব্যবসার ওপর। কিন্তু মাস্কের বিনিয়োগের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে এসে বসবাস শুরু করেন।
স্থানীয় রিয়েল এস্টেট এজেন্ট জুডা রস জানান, মাস্কের আগমনের পর অনেক বাড়ির দাম প্রায় রাতারাতি দ্বিগুণ হয়ে যায়। কিছু সম্পত্তির মূল্য প্রথমবারের মতো ১০ লাখ ডলার অতিক্রম করে।
শুধু বাড়ির দামই নয়, নতুন রেস্তোরাঁ, খুচরা ব্যবসা এবং আবাসন প্রকল্পও দ্রুত বেড়েছে। উচ্চমূল্যের আবাসন প্রকল্প ‘দ্য কলোনি’-তে এখন ৬ লাখ ডলার বা তার বেশি মূল্যের বাড়ি বিক্রি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জ
বাস্ত্রপের এই প্রবৃদ্ধির পেছনে শুধু মাস্ক নন, কোভিড-পরবর্তী দূরবর্তী কর্মসংস্থানের বিস্তার, কম সুদের হার এবং অস্টিনের কাছাকাছি অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, যানজট এখন বড় মাথাব্যথা। আগে যে পথে যেতে ২০ মিনিট লাগত, ব্যস্ত সময়ে এখন সেখানে ৪০ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগছে।
শহরের নির্বাচিত প্রতিনিধি জন কার্কল্যান্ড বলেন, এই প্রবৃদ্ধি পুরোপুরি থামানোর মতো ক্ষমতা স্থানীয় প্রশাসনের হাতে নেই। আইন মেনে চললে মাস্ক ও তার কোম্পানিগুলো তাদের প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারবে।
বাস্ত্রপের দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের মধ্যে তাই একদিকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ, অন্যদিকে দ্রুত পরিবর্তনের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। স্পেসএক্সের আইপিও-পরবর্তী অর্থপ্রবাহ সেই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলেই মনে করছেন অনেকেই।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















