জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের ব্যয়বহুল কর্মসূচি নিয়ে অসন্তোষের জেরে ইন্দোনেশিয়াজুড়ে নতুন করে ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর ক্ষমতায় আসার দেড় বছরের মাথায় ধারাবাহিক এই বিক্ষোভ দেশটির সরকারের নীতিনির্ধারণ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনঅসন্তোষের গভীরতা সামনে এনে দিয়েছে।
গত সপ্তাহে সরকার ভর্তুকিবিহীন জ্বালানির দাম ৩০ শতাংশেরও বেশি বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর রাজধানী জাকার্তাসহ বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদের ঢেউ শুরু হয়। বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্বল হয়ে পড়া রুপিয়া এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তোলে।
বিক্ষোভে হাজারো শিক্ষার্থী
শুক্রবার বৃহত্তর জাকার্তার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী রাজধানীর হোটেল ইন্দোনেশিয়া ট্রাফিক সার্কেলে সমাবেশ করে। “#MenujuIndonesiaBangkrut” বা “দেউলিয়ার পথে ইন্দোনেশিয়া” শিরোনামে আয়োজিত এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ উপেক্ষা করে সরকার ব্যয়বহুল কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।

বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে ছিল রাষ্ট্রীয় অপচয় কমানো, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম হ্রাস, রুপিয়ার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সরকারের কয়েকটি বড় প্রকল্প স্থগিত করা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি, যার জন্য চলতি বছরে ২৬৮ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন
সোমবার পর্যন্ত বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে এবং তা মধ্য জাভার সেমারাং, পূর্ব জাভার সুরাবায়া, উত্তর সুমাত্রার মেদান, লাম্পুং ও পশ্চিম জাভার বান্দুংসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
একই দিনে যোগ্যাকার্তার গাজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায়ও উত্তেজনা দেখা দেয়। সেখানে উপ-কৃষিমন্ত্রী সুদারিওনো বক্তব্য দিতে গেলে একদল শিক্ষার্থী অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি জানিয়ে প্রতিবাদ করে। বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি হামলার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন এবং পরে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে সরিয়ে নিয়ে যান।
শুধু জ্বালানির দাম নয়, ক্ষোভের মূল আরও গভীরে
জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থা (বিআরআইএন)-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক লিলি রোমলি মনে করেন, সাম্প্রতিক আন্দোলনের কারণ শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নয়। বরং সরকারের নীতিনির্ধারণ, সমালোচনা মোকাবিলার ধরন এবং জনমতের প্রতিফলন না ঘটার অভিযোগও এর পেছনে কাজ করছে।

তার মতে, সরকারপন্থী দলগুলোর প্রাধান্যের কারণে সংসদ কার্যকর নজরদারির ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ফলে অনেক নাগরিক নিজেদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিনিধিত্বহীন মনে করছেন এবং দাবি আদায়ে রাজপথকেই বেছে নিচ্ছেন।
দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষের ধারাবাহিকতা
২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রাবোও ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন ইস্যুতে বিক্ষোভ দেখা গেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে মূল্য সংযোজন কর বৃদ্ধির পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। পরে ২০২৫ সালের শুরুতে “ইন্দোনেশিয়া গেলাপ” বা “অন্ধকার ইন্দোনেশিয়া” আন্দোলনে বাজেট কাটছাঁটের বিরোধিতা করা হয়, বিশেষ করে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের আগস্টে এক মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।
সরকারের জন্য সতর্কবার্তা
ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আদিত্য পারদানা মনে করেন, বারবার রাজপথে মানুষ নামা সরকারের জন্য একটি গুরুতর রাজনৈতিক সতর্কসংকেত। তার ভাষায়, অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না হওয়া এবং সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ থেকেই জনঅসন্তোষ বাড়ছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও এখনো সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট গিবরান রাকাবুমিং রাকা সোমবার ১৫ জন ছাত্র প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করে তাদের মতামতের জন্য ধন্যবাদ জানান।
সরকারের যোগাযোগ সংস্থার প্রধান মুহাম্মদ কোদারি অবশ্য সমালোচনার জবাবে বলেছেন, প্রাবোও বৃহৎ অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর আধিপত্য ভাঙার চেষ্টা করছেন। তিনি বিতর্কিত বিনামূল্যের পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচিও চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বলেন, চ্যালেঞ্জ থাকলেও তা কর্মসূচি বন্ধ করার কারণ নয়; বরং মূল্যায়ন ও উন্নয়নের সুযোগ।
ইন্দোনেশিয়ায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ও জনঅসন্তোষের বৃহত্তর প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















