ইন্দোনেশিয়ায় জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইতোমধ্যেই চাকরির অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করছে। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি পার্তামিনা বুধবার তাদের সবচেয়ে ব্যবহৃত ভর্তুকিবিহীন পেট্রোল ব্র্যান্ড ‘পার্তাম্যাক্স’-এর দাম ৩২ শতাংশ বাড়িয়েছে। বৈশ্বিক তেলের দাম দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও এতদিন দাম সমন্বয় থেকে বিরত ছিল প্রতিষ্ঠানটি।
জাকার্তার কর্মজীবী লিয়া চিত্রা সান্তি বানেজা, যিনি নিয়মিত মোটরসাইকেলে করে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন, বলেছেন এই মূল্যবৃদ্ধি তার মাসিক ব্যয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তার ভাষায়, প্রয়োজনের বাইরে অন্যান্য খরচ কমিয়ে আনতে হবে। খাদ্যপণ্যের দামও ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে, যা তাকে আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
খাদ্য ও পরিবহন খরচে নতুন চাপ
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সাধারণত পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যার প্রভাব পড়ে পণ্যের সরবরাহ ও বিতরণ খরচে। এর ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হয়। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সার ও প্যাকেজিং উপকরণের বাজারে চাপ তৈরি হওয়ায় খাদ্যপণ্যের দাম আগেই বাড়ছিল। গত মাসেও খাদ্যদ্রব্য ছিল মূল্যস্ফীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

ব্যাংক সেন্ট্রাল এশিয়ার (বিসিএ) প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড সুমুয়ালের মতে, পার্তাম্যাক্সের নতুন মূল্য জুন মাসের মূল্যস্ফীতিতে অতিরিক্ত ০.৮৬ থেকে ১.২৫ শতাংশ পয়েন্ট যোগ করতে পারে। ফলে ভোক্তা মূল্যসূচক প্রায় ৪ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, যা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত ও গণপরিবহন উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়বে। অতীতে দেখা গেছে, জ্বালানির দাম বাড়ার তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে গণপরিবহনের ভাড়াও সমন্বয় করা হয়।
মধ্যবিত্তের সংকট কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইন্দোনেশিয়ার পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, মধ্যবিত্ত পরিবারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৮ শতাংশ পরিবহন খাতে যায়। জাকার্তার মতো বড় শহরে এ হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
দেশটির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তে উত্তরণের পথে রয়েছে। এই গোষ্ঠী মিলেই জাতীয় পারিবারিক ব্যয়ের ৮০ শতাংশের বেশি বহন করে, যা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে তাদের ওপর চাপ বাড়লে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ভর্তুকি সংস্কার নিয়ে বিতর্ক
অনেক ভোক্তা তুলনামূলক সস্তা ভর্তুকিপ্রাপ্ত জ্বালানি ‘পার্তালিতে’ ঝুঁকতে পারেন। তবে এর সরবরাহ নির্দিষ্ট কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কোটা শেষ হয়ে গেলে তাদের বাধ্য হয়েই বেশি দামের ভর্তুকিবিহীন জ্বালানি কিনতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘ইন্দোনেশিয়া ইকোনমিক প্রসপেক্ট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি ভর্তুকির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশের ধনী ২০ শতাংশ পরিবার। প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, বৈশ্বিক তেলের উচ্চমূল্য ভর্তুকি সংস্কারের সুযোগ তৈরি করেছে। তাদের সুপারিশ হলো—সবার জন্য ভর্তুকি দেওয়ার বদলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা চালু করা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সংস্কার রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করলেও মধ্যবিত্তের ভোগব্যয় কমিয়ে দিতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।
চাকরির বাজারে কাঠামোগত সংকট
আন্দালাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অধ্যাপক সিয়াফরুদ্দিন কারিমি বলেন, মধ্যবিত্তরা একদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সহজে সামাল দিতে পারে না, অন্যদিকে সামাজিক সহায়তার আওতাতেও পড়ে না। ফলে তারাই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে।

বিশ্বব্যাংকও ইন্দোনেশিয়ার শ্রমবাজারে একটি “কাঠামোগত অমিল”-এর কথা উল্লেখ করেছে। অর্থনীতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল ও উচ্চ আয়ের চাকরি তৈরি হচ্ছে না। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবিত্ত আয়ভুক্ত শ্রমিকের হার ২০১৮ সালের ১৪.৫ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে কমে মাত্র ৭ শতাংশের সামান্য ওপরে নেমে এসেছে।
অর্থনীতিবিদ ডেভিড সুমুয়ালের মতে, এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তার পরামর্শ, স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের বদলে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত, কারণ এটি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—দুই ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি এবং চাকরির অনিশ্চয়তা—এই তিন চাপ একসঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্ত শ্রেণির সামনে নতুন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















