কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রানঅফকে ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ডানপন্থী প্রার্থী আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া এই আইনজীবী নিজেকে ‘দ্য টাইগার’ নামে পরিচয় দেন এবং কঠোর নেতৃত্ব, নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। তবে তাঁর প্রচারণার ভাষা, নারীবিষয়ক অবস্থান এবং প্রকাশ্য মন্তব্য দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
৪৭ বছর বয়সী এসপ্রিয়েলা প্রচারণায় নিজেকে শক্তিশালী, আপসহীন ও ঐতিহ্যবাদী নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে বামপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা। জনমত জরিপে তিনি বামপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ইভান সেপেদার চেয়ে এগিয়ে থাকলেও, নারী অধিকারকর্মীদের মধ্যে তাঁর উত্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নারীর অধিকার নিয়ে শঙ্কা
কলম্বিয়া লাতিন আমেরিকায় নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্যতম অগ্রসর দেশ হিসেবে পরিচিত। গর্ভপাত বৈধকরণ থেকে শুরু করে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন—সব ক্ষেত্রেই দেশটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
কিন্তু এসপ্রিয়েলা ব্যক্তিগতভাবে গর্ভপাতের বিরোধিতা করেন। তিনি সমলিঙ্গ দম্পতির সন্তান দত্তক গ্রহণের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, যৌন শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব স্কুলের নয়, পরিবারের। পাশাপাশি তিনি তথাকথিত ‘জেন্ডার আইডিওলজি’র বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।

নারী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, ক্ষমতায় গেলে তিনি সরাসরি আইন পরিবর্তনের চেষ্টা না করলেও নারী ও লিঙ্গসমতা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সংকুচিত করতে পারেন।
রাষ্ট্র ছোট করার প্রতিশ্রুতি
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর পথ অনুসরণ করে এসপ্রিয়েলা রাষ্ট্রের আকার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি সমতা মন্ত্রণালয় বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বলেছেন। তাঁর সমর্থকদের মতে, এটি অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানোর অংশ। তবে সমালোচকদের মতে, এতে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নারী ভোটারদের মধ্যে বিভক্তি
এসপ্রিয়েলাকে ঘিরে নারী ভোটারদের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। অনেক নারী তাঁকে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিনিধি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, তাঁর বক্তব্য ও আচরণ নারীদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে না।
অন্যদিকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ভোটার মনে করেন, দেশের প্রধান সমস্যা নিরাপত্তাহীনতা ও মাদকচক্রের বিস্তার। তাদের কাছে নারী অধিকার প্রশ্নের চেয়ে অপরাধ দমন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসপ্রিয়েলার কঠোর অবস্থান তাদের সমর্থন পাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক ইস্যুর পাশাপাশি লিঙ্গ রাজনীতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।

বিতর্কিত মন্তব্য ও আদালতের রায়
নির্বাচনী প্রচারণার সময় এসপ্রিয়েলা একাধিক বিতর্কে জড়িয়েছেন। এক নারী সাংবাদিকের সঙ্গে টেলিভিশন আলোচনায় তাঁর আচরণ ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সাংবাদিকটি পরে জানান, তিনি নিজেকে হয়রানির শিকার বলে অনুভব করেছেন।
ঘটনার জেরে নারী অধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও রাজনীতিকদের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পরে একজন বিচারক রায় দেন যে, নারী ভোটারদের বিচারবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি “লিঙ্গভিত্তিক রাজনৈতিক সহিংসতা” করেছেন। আদালত তাঁকে কলম্বিয়ার নারীদের কাছে ক্ষমা চাইতে নির্দেশ দেয়।
তবে তাঁর সমর্থকেরা এসব সমালোচনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন। তাদের মতে, বিরোধীরা ‘ক্যানসেল কালচার’-এর মাধ্যমে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।
নির্বাচনের বড় প্রশ্ন
এই নির্বাচনের মাধ্যমে কলম্বিয়ার ভোটাররা শুধু দুই প্রার্থীর মধ্যে একজনকে বেছে নেবেন না, বরং দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন। নারী অধিকার আন্দোলনের নেতারা বলছেন, দীর্ঘ সংগ্রামে অর্জিত অধিকারগুলো কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সেটিও এই নির্বাচনের অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে এসপ্রিয়েলার সমর্থকেরা বিশ্বাস করেন, শক্তিশালী নেতৃত্বই বর্তমানে কলম্বিয়ার সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন। ফলে রানঅফ ভোটের ফল শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















