বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) একসময় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি একটি ভিন্ন প্রশ্ন সামনে এনেছে—এই ট্রাইব্যুনাল কি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে এমন ক্ষেত্রেও হস্তক্ষেপ করছে, যেখানে বিচারিক সংযম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন?
একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক সংবাদ উপস্থাপক ফারজানা রূপা এবং প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তি ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত সহিংসতা এবং সেই ঘটনার সংবাদ প্রচার। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং বিচারব্যবস্থা পর্যবেক্ষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সাংবাদিকতা ও অপরাধের সীমারেখা
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক পক্ষপাত কিংবা ভুল তথ্য প্রচার—এসব নিয়ে সাংবাদিকদের সমালোচনা নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো সংবাদ প্রতিবেদন বা তথ্য উপস্থাপন কতটা গুরুতর হলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছায়?
আইসিটির প্রধান কৌঁসুলি যুক্তি দিয়েছেন যে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা শাপলা চত্বরের ঘটনায় প্রকৃত তথ্য গোপন করেছেন এবং বিভ্রান্তিকর বর্ণনা দিয়েছেন। তার মতে, এই প্রচারণা বৃহত্তর একটি পরিকল্পনার অংশ ছিল। কিন্তু এখানেই আইনি ও নৈতিক জটিলতা তৈরি হয়। কোনো প্রতিবেদনের তথ্যগত দুর্বলতা বা রাজনৈতিক পক্ষপাত কি এমন অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা সাধারণত গণহত্যা, নিপীড়ন বা ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পর্কিত?
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযোগকারীরা এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রচার বা বক্তব্য সামনে আনতে পারেননি, যা সরাসরি সহিংসতা উসকে দেওয়া বা অপরাধ সংঘটনে সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ বহন করে।

আন্তর্জাতিক নজির কী বলে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ইতিহাসে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা অত্যন্ত বিরল। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ রুয়ান্ডার গণহত্যা। সেখানে কিছু রেডিও উপস্থাপক ও সংবাদপত্র সম্পাদককে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল কারণ তারা প্রকাশ্যে এবং ধারাবাহিকভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে হত্যা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের সম্প্রচারে টুটসি জনগোষ্ঠীকে অমানবিক ভাষায় আখ্যায়িত করা হয়েছিল এবং সহিংসতাকে সরাসরি উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল।
এই নজিরের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান মামলার একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এখানে এখন পর্যন্ত এমন কোনো অভিযোগ সামনে আসেনি যে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা কাউকে হত্যা, নিপীড়ন বা সহিংসতার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছেন। বরং অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঘটনাবলির ব্যাখ্যা, উপস্থাপন এবং সংবাদ কাভারেজের ধরন।
প্রেস স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত?
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের মূল কারণ এখানেই। যদি বিতর্কিত বা পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় আনা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যে কোনো সাংবাদিক রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ঘটনা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যমের কাজ হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, বিতর্কিত বিষয় তুলে ধরা এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ করা। সেই কাজ নিখুঁত নাও হতে পারে; তাতে ভুল, পক্ষপাত বা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু সেসব ত্রুটির প্রতিকার সাধারণত মানহানি আইন, গণমাধ্যম নীতিমালা বা পেশাগত জবাবদিহিতার মাধ্যমে হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের মতো সর্বোচ্চ মাত্রার বিচারিক কাঠামো ব্যবহার করা হলে তা ভিন্ন ধরনের বার্তা দেয়।

আইসিটির ভবিষ্যৎ বিশ্বাসযোগ্যতা
বাংলাদেশের আইসিটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে এটি মুক্তিযুদ্ধের ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান মামলাগুলো সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে।
বিশেষ করে যখন একই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এবং রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও অভিযুক্ত করা হচ্ছে, তখন জনমনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—অভিযোগের মানদণ্ড কি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে, নাকি ট্রাইব্যুনালের পরিধি ক্রমশ এমন জায়গায় বিস্তৃত হচ্ছে যেখানে অপরাধ ও মতপ্রকাশের মধ্যে পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে?
বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার শক্তি তার ব্যাপ্তিতে নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতায়। মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণের মানদণ্ডও হতে হবে ততটাই কঠোর। অন্যথায় ন্যায়বিচারের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠানই অনিচ্ছাকৃতভাবে স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—গুরুতর অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন একটি পরিবেশ বজায় রাখা, যেখানে সাংবাদিকতা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে না, যদি না তা সত্যিই সহিংসতা বা আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য অনেকাংশেই এই ভারসাম্য রক্ষার ওপর নির্ভর করে।
ডেভিড বার্গম্যান 



















