ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন—এ কথা তার নিজের প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছিলেন। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট, অ্যাটর্নি জেনারেল, গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা তাকে জানিয়েছিলেন যে নির্বাচনের ফল বদলে দেওয়ার মতো কোনো জালিয়াতির প্রমাণ নেই। তবুও ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, নির্বাচন ‘চুরি’ হয়েছে এবং ভোটে কারচুপি হয়েছে।
মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জামেল বুইয়ের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থানকে কেবল একটি মিথ্যা অভিযোগ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। তার মতে, ‘ভোট জালিয়াতি’ নিয়ে ট্রাম্পের অবিরাম প্রচারণা আসলে আমেরিকায় কারা রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ এবং কারা ভোট দেওয়ার বৈধ অধিকার রাখে—সেই বৃহত্তর বিতর্কের প্রতিফলন।
২০২০ সালের নির্বাচনের পর ট্রাম্প বিশেষভাবে নজর দিয়েছিলেন আটলান্টা, ডেট্রয়েট, মিলওয়াকি ও ফিলাডেলফিয়ার মতো শহরগুলোর দিকে, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তিনি ও তার সমর্থকেরা দাবি করেছিলেন, এসব এলাকায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। কিন্তু তদন্ত, আদালতের শুনানি এবং সরকারি পর্যালোচনায় এমন অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বুই মনে করেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল অন্য কিছু। তার বিশ্লেষণে, ডেমোক্র্যাটদের বিজয়কে ‘জালিয়াতির ফল’ বলা মানে পরোক্ষভাবে এই দাবি করা যে কিছু মানুষের ভোটকে বৈধ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। অর্থাৎ বিতর্কটি ভোট গণনার প্রযুক্তিগত বিষয়ের চেয়ে বেশি সম্পর্কিত কে প্রকৃত ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে।
এই বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে সম্প্রতি লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনের প্রথম ধাপকে কেন্দ্র করে। সাবেক রিয়েলিটি টেলিভিশন তারকা এবং রিপাবলিকানপন্থী প্রার্থী স্পেনসার প্র্যাট প্রথমদিকে এগিয়ে থাকলেও ডাকযোগে আসা ভোট গণনার পর তিনি পিছিয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত সিটি কাউন্সিল সদস্য নিত্যা রামান দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসে নভেম্বরের নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন নিশ্চিত করেন।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোট কারচুপির অভিযোগ ছড়াতে শুরু করেন প্র্যাট ও তার সমর্থকেরা। কয়েকজন প্রভাবশালী রিপাবলিকানও কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, জালিয়াতি ছাড়া এমন ফল সম্ভব নয়।
তবে নির্বাচনী বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোট গণনার বিভিন্ন ধাপের কারণে প্রাথমিক ফলাফল ও চূড়ান্ত ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার মুহূর্তেই প্রকৃত ফল নির্ধারিত হয়ে যায়; পরে কেবল সেই ভোটগুলো গণনা করা হয়। ফলে কোনো প্রার্থী শুরুতে এগিয়ে থাকলেও পরবর্তী গণনায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।
বুই উল্লেখ করেন, লস অ্যাঞ্জেলেসে ডেমোক্র্যাট ভোটারের সংখ্যা রিপাবলিকানদের তুলনায় অনেক বেশি। তাই প্র্যাটের পরাজয় ব্যাখ্যা করতে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রয়োজন নেই; ভোটারদের সংখ্যাগত বাস্তবতাই যথেষ্ট।
তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিপাবলিকান রাজনীতির একটি অংশ ‘ভোট জালিয়াতি’ অভিযোগকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে একদিকে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করা হয়, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের ভোটারদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
সম্প্রতি এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারও ২০২০ সালের নির্বাচনকে ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন, ক্যালিফোর্নিয়াতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশের মতো’ বলেও মন্তব্য করেন।
জামেল বুইয়ের মতে, অভিবাসী অধ্যুষিত শহরগুলোকে ভোট জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত করার এই প্রবণতা কেবল নির্বাচনী অভিযোগ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। সেই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, দেশের সব নাগরিক সমানভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার নন।
লেখকের সতর্কবার্তা হলো, লস অ্যাঞ্জেলেসের এই বিতর্ক হয়তো ভবিষ্যতের আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাতের পূর্বাভাস। যদি আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রত্যাশিত ফল না পায়, তাহলে ‘ভোট জালিয়াতি’ অভিযোগ আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। তার মতে, সমস্যার মূল নির্বাচন ব্যবস্থায় নয়; বরং কে দেশ পরিচালনার বৈধ অধিকার রাখে, সেই প্রশ্নকে ঘিরেই এই সংঘাতের জন্ম।
ট্রাম্পের ভোট জালিয়াতি অভিযোগ
ট্রাম্পের অব্যাহত ভোট জালিয়াতি অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক বৈধতা, ভোটাধিকার ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ—তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন জামেল বুই।
ট্রাম্পের ‘ভোট জালিয়াতি’ বয়ান কি শুধু নির্বাচনী অভিযোগ, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য? পড়ুন বিশ্লেষণ।
#ডোনাল্ড_ট্রাম্প #মার্কিন_নির্বাচন #ভোট_জালিয়াতি #জামেল_বুই #যুক্তরাষ্ট্র_রাজনীতি #লস_অ্যাঞ্জেলেস #রিপাবলিকান #ডেমোক্র্যাট #সারাক্ষণ




















