বড় টুর্নামেন্টের আগে খেলোয়াড়দের যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার পরামর্শ বা নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়। ফুটবল থেকে বাস্কেটবল—বিভিন্ন খেলায় কোচ, ম্যানেজার কিংবা ক্লাব মালিকেরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করে এসেছেন যে যৌনতা থেকে দূরে থাকলে খেলোয়াড়রা মাঠে বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, এই ধারণার পক্ষে শক্ত কোনো প্রমাণ নেই।
সম্প্রতি এই বিতর্ক আবারও আলোচনায় আসে যুক্তরাষ্ট্রের এনবিএ চ্যাম্পিয়ন নিউইয়র্ক নিকসকে ঘিরে। ৫৩ বছর পর শিরোপা জয়ের পর প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, ক্লাবটির মালিক জেমস ডোলান ফাইনালের অনেক আগে খেলোয়াড়দের দশ সপ্তাহ যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
প্রাচীন স্পার্টার উদাহরণ
রুমমেটস শো নামের একটি পডকাস্টে প্রকাশিত ভিডিওতে ৭১ বছর বয়সী ডোলান খেলোয়াড়দের বলেন, প্রাচীন স্পার্টান যোদ্ধারা নিজেদের কিছু বিষয় থেকে বঞ্চিত রাখতেন যাতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। সেই যুক্তিতেই তিনি খেলোয়াড়দের যৌনতা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, স্পার্টানদের জীবনযাপন নিয়ে এমন ধারণারও শক্ত প্রমাণ নেই। বরং তারা যোদ্ধা হওয়ার পাশাপাশি প্রেম ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
খেলাধুলায় পুরোনো বিশ্বাস
বিশ্বকাপ বা বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আগে যৌনতা নিয়ে নানা বিধিনিষেধের নজির রয়েছে। ২০১০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলের ক্যাম্পে স্ত্রী ও বান্ধবীদের প্রবেশ সীমিত করেছিলেন তৎকালীন কোচ ফাবিও ক্যাপেলো।
এরও আগে রয় হজসন সুইজারল্যান্ড দলের দায়িত্বে থাকাকালে খেলোয়াড়দের ওপর কঠোর যৌন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। তবে খেলোয়াড়দের অসন্তোষের মুখে পরে সেই অবস্থান শিথিল করতে হয়।
২০১৪ সালে ব্রাজিল দলের কোচ লুইজ ফেলিপে স্কলারিও যৌন সম্পর্ককে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করলেও অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমসাপেক্ষ আচরণ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
বিজ্ঞান কী বলছে?
যৌনতা ও ক্রীড়া পারফরম্যান্সের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা সহজ নয়। তবুও এ পর্যন্ত পাওয়া অধিকাংশ গবেষণার ফল প্রায় একই।
২০১৬ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন ফিজিওলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিযোগিতার ১২ ঘণ্টা আগে যৌন সম্পর্ক ক্রীড়া পারফরম্যান্সের ক্ষতি করে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
এরপর ২০২২ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে বলা হয়, প্রতিযোগিতার ৩০ মিনিট থেকে ২৪ ঘণ্টা আগে যৌন কার্যকলাপ অ্যারোবিক সক্ষমতা, শক্তি, ক্ষমতা বা পেশির সহনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না।
আরও চমকপ্রদ ফল এসেছে চলতি বছরের একটি গবেষণায়। সেখানে প্রশিক্ষিত ২১ জন পুরুষ ক্রীড়াবিদকে দুই দলে ভাগ করা হয়। একদলকে অর্গাজম পর্যন্ত হস্তমৈথুন করতে বলা হয়, অন্য দলকে বিরত থাকতে বলা হয়। আধা ঘণ্টা পর তাদের সাইক্লিং ও গ্রিপ শক্তির পরীক্ষা নেওয়া হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, যৌন উত্তেজনা ও অর্গাজমের অভিজ্ঞতা পাওয়া দলটি সাইক্লিং পরীক্ষায় প্রায় ৩ শতাংশ ভালো ফল করে।
মিথ টিকে আছে কেন?
গবেষকদের মতে, সাধারণ যৌন কার্যকলাপে খুব বেশি শক্তি খরচ হয় না। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি সেশনে গড়ে প্রায় ৮৫ ক্যালোরি শক্তি ব্যয় হয়, যা একটি ছোট চকলেট বারের সমান। ফলে এটি একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদের শক্তির ভাণ্ডারকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ার মতো নয়।
এ ছাড়া যৌন তৃপ্তির পর শরীরে টেস্টোস্টেরন ও কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে, যা স্বল্পমেয়াদে ক্রীড়া সক্ষমতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবুও যৌনতা বর্জনের ধারণা টিকে আছে, কারণ এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ত্যাগের একটি প্রতীকী বার্তা বহন করে। অনেক কোচের কাছে এটি খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার একটি উপায়। তবে বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, যৌনতা থেকে বিরত থাকলেই মাঠে অতিরিক্ত সাফল্য মিলবে—এমন বিশ্বাসের পক্ষে এখনো কোনো শক্ত ভিত্তি নেই।
#ক্রীড়াবিজ্ঞান #এনবিএ #নিউইয়র্কনিকস #জেমসডোলান #যৌনস্বাস্থ্য #স্পোর্টসপারফরম্যান্স #বিজ্ঞান #খেলাধুলা #স্বাস্থ্যসংবাদ #সারাক্ষণ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















