থাইল্যান্ড সরকারের ১.৬ বিলিয়ন বাথ ব্যয়ের ‘টিএইচ-এআই পাসপোর্ট’ প্রকল্পকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। বিরোধী পিপলস পার্টি অভিযোগ করেছে, প্রকল্পটির নকশা, ব্যয় নির্ধারণ ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় নানা অসঙ্গতি রয়েছে। তাদের দাবি, বিষয়টি ভবিষ্যতে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে দেশটির ডিজিটাল অর্থনীতি ও সমাজ মন্ত্রণালয় অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, প্রকল্পটি সব বিধিবিধান মেনেই পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
জনপ্রয়োজন নাকি বাজেট খরচের হিসাব?
পিপলস পার্টির তালিকাভুক্ত সংসদ সদস্য ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা পাওউট পংভিতায়াপানু প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তার দাবি, প্রকল্পের আকার জনগণের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়নি; বরং ডিজিটাল ইকোনমি অ্যান্ড সোসাইটি ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে অবশিষ্ট অর্থের ভিত্তিতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে পুরো ১.৬ বিলিয়ন বাথের বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়, পরে সম্ভাব্য বার্ষিক এআই ব্যবহারের খরচ ধরে ৫০ লাখ ব্যবহারকারীর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এতে প্রকৃত জনচাহিদার মূল্যায়ন অনুপস্থিত ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
পাওউটের অভিযোগ, প্রকল্পের শর্তাবলি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সুবিধা পেতে পারে। প্রকল্পটি মূলত এআই সেবা নিয়ে হলেও এতে প্রায় ১,৫০০টি কনভেনিয়েন্স স্টোরের বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা এবং দেশজুড়ে প্রায় ৬,০০০টি ডিসপ্লে স্ক্রিন সংক্রান্ত শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তার দাবি, রেফারেন্স মূল্য নির্ধারণ এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় যুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খুচরা বিজ্ঞাপন খাতের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট অপারেটরদের সুবিধা দিতে সাজানো হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে।
তিনি আরও বলেন, বড়দিন ও বছরের শেষের ছুটির সময়ে ২৪ ডিসেম্বর দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং মাত্র ৩৪ দিনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এত অল্প সময়ে প্রস্তাব প্রস্তুত করা সাধারণ প্রতিযোগীদের জন্য কঠিন ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
‘এআই পাসপোর্ট’ অ্যাপ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
অনলাইনে এমন তথ্যও ছড়িয়েছে যে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান প্ল্যান বি মিডিয়া পিএলসি ‘এআই পাসপোর্ট’ নামে একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ তৈরি করেছিল, যা ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বল্প সময়ের জন্য গুগল প্লে স্টোরে দেখা যায়।
সমালোচকদের দাবি, ওই অ্যাপের বৈশিষ্ট্য সরকারি টিএইচ-এআই পাসপোর্ট প্রকল্পের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়। তবে প্ল্যান বি মিডিয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তারা দরপত্র প্রক্রিয়ার অংশও ছিল না।
সরাসরি কেনা হয়নি কেন?
পাওউট প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার কেন বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সরাসরি এআই সেবা সংগ্রহ করেনি। তার মতে, সিঙ্গাপুর ও মাল্টার মতো দেশ সরাসরি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে এ ধরনের সেবা নিয়েছে।
এ ছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, থাইল্যান্ডের অফিস অব নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের তৈরি একটি অনুরূপ এআই প্ল্যাটফর্মের ব্যয় ছিল মাত্র ২৪ লাখ বাথ। সেই তুলনায় বর্তমান প্রকল্পের ১.৬ বিলিয়ন বাথ ব্যয় যৌক্তিক কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিরোধীদের নজরদারি অব্যাহত
পাওউটের মতে, প্রকল্পের কারিগরি সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য লাভের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বিপুল মুনাফা অর্জনের সুযোগ পেতে পারে।
এ বিষয়ে ইতোমধ্যে সংসদীয় প্রশ্নোত্তর, বিভিন্ন কমিটির বৈঠক এবং অর্থপাচারবিরোধী কমিটির আলোচনায় বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। বিরোধীরা তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
সরকারের জবাব
ডিজিটাল অর্থনীতি মন্ত্রী অভিযোগগুলো নাকচ করে বলেছেন, বিরোধীরা চাইলে প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেই তদন্তের দাবি তুলতে পারে।
তার দাবি, মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো ক্রয়প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে দেখেছে যে সব কার্যক্রম বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, প্রকল্পটি করদাতাদের অর্থের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করবে। নিবন্ধিত ব্যবহারকারীরা সেবা ব্যবহার না করলে সরকার যেন প্রকৃত ব্যবহারের ভিত্তিতেই অর্থ পরিশোধ করে, সে লক্ষ্যে আলোচনাও চলছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মন্ত্রীদের কাজ হলো নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন তদারকি করা; সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা নয়।
থাইল্যান্ডের ১.৬ বিলিয়ন বাথের ‘টিএইচ-এআই পাসপোর্ট’ প্রকল্প নিয়ে বিরোধীদের অনিয়মের অভিযোগ এবং সরকারের পাল্টা অবস্থান।
#থাইল্যান্ড #এআইপাসপোর্ট #কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা #ডিজিটালঅর্থনীতি #থাইরাজনীতি #প্রযুক্তি #সরকারিপ্রকল্প #এআইসেবা #দরপত্র #সারাক্ষণ_রিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















