ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে উত্তপ্ত বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে বলে জামায়াতে ইসলামীর এক সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পর তা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একাধিক দফায় বাকবিতণ্ডা হয়। শেষ পর্যন্ত ডেপুটি স্পিকার বক্তব্যের একটি অংশ সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন।
বাজেট আলোচনায় বিতর্কের সূত্রপাত
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মেহেরপুর-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দিন খান বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বাজেটে ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে প্রায় ৯০টি পরিবার এই সুবিধা পাবে।
এ সময় তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিপুল সংখ্যক দরিদ্র পরিবার এই সুবিধার বাইরে থেকে গেলে তাদের পরিস্থিতি কী হবে। তার দাবি, কার্ড পাওয়ার প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের সঙ্গে ধর্ষণ ও অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে।
বিএনপির আপত্তি, বক্তব্য এক্সপাঞ্জ
তাজউদ্দিন খানের বক্তব্যের পরপরই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আপত্তি জানান নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এম মাহবুবউদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, সংসদে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাষা ব্যবহারে সংযম ও শালীনতা থাকা প্রয়োজন।
তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে ধর্ষণ’ সংক্রান্ত মন্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান। পরে অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বক্তব্যটিকে আপত্তিকর হিসেবে উল্লেখ করে তা এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেন।
জামায়াতের আপত্তি ও পাল্টা যুক্তি
ডেপুটি স্পিকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন জামায়াতের হুইপ ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, কোনো বক্তব্য অসত্য বা অসংসদীয় না হলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
এরপর আবার বক্তব্য দেন তাজউদ্দিন খান। নিজের বক্তব্যের পক্ষে তিনি কয়েকটি ঘটনার তথ্য তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল ফরিদপুরের সোনাগাজী থানায় ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত ২৫ এপ্রিল রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ভাঙা ইউনিয়ন পরিষদের বিএনপির এক সহ-সম্পাদককে একই ধরনের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ডেপুটি স্পিকারের ব্যাখ্যা
বিতর্কের একপর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কোনো ব্যক্তি বা সরকারের একক বিষয় নয়; এটি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা কর্মসূচি এবং অনেক মানুষের আশার প্রতীক।
মাগরিবের নামাজের বিরতির পর বিষয়টি আবার সংসদে উত্থাপন করেন রফিকুল ইসলাম খান। তিনি দাবি করেন, যেসব ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে কিংবা দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে অসত্য বলা যায় না। তার মতে, তাজউদ্দিন খান ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সমালোচনা করেননি; বরং কার্ডকে ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
শেষ পর্যন্ত ডেপুটি স্পিকার জানান, পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট মামলা, স্থান ও তথ্যসূত্র উল্লেখ করে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সংসদের রেকর্ডে বহাল থাকবে। সরকারি দলের কয়েকজন সদস্য আপত্তি তুললেও তিনি রুলিং দিয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি ঘোষণা করেন।
ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে জাতীয় সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বক্তব্য এক্সপাঞ্জের সিদ্ধান্ত ঘিরে সরকার, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান দেখা যায়।
#ফ্যামিলি_কার্ড #সংসদ_বিতর্ক #টিসিবি #জাতীয়_সংসদ #বাজেট২০২৬_২৭ #জামায়াতে_ইসলামী #বিএনপি #বাংলাদেশ_রাজনীতি #বাংলাদেশ_সংবাদ #সারাক্ষণ
Sarakhon Report 



















