প্রায় এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী ধরে ঋণের সুদ শোধ করতে নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করেছে পাকিস্তান। দীর্ঘদিনের সেই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার কিছু লক্ষণ এবার দেখা গেলেও অর্থনীতির মূল কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান প্রথমবারের মতো এমন অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে সরকার নিয়মিত আয় থেকে ঋণের সুদ পরিশোধের সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অগ্রগতি এখনও স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়নি।
ঋণের চক্র কীভাবে তৈরি হয়েছিল
বছরের পর বছর পাকিস্তান সরকারের ব্যয় ছিল আয়ের চেয়ে বেশি। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ধারাবাহিকভাবে নতুন ঋণ নিতে হয়েছে। সেই ঋণের সুদ পরিশোধ করতেও আবার নতুন ঋণ নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতির কারণে ২০১২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একই সময়ে সরকারের আয়ের বড় একটি অংশ চলে যেত কেবল ঋণের সুদ পরিশোধে।

মুদ্রাস্ফীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভূমিকা
অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও এই ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। এর পেছনে ছিল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দেশের ব্যাংকগুলো সরকারের বড় ঋণদাতা হিসেবে কাজ করেছে। পাশাপাশি উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে পুরোনো ঋণের প্রকৃত মূল্য কমে এসেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয়। ব্যাংকিং খাত থেকে অর্জিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফার একটি বড় অংশ সরকার রাজস্ব হিসেবে পেয়েছে, যা বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে সহায়তা করেছে।
স্বস্তির কিছু ইঙ্গিত
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ঋণের সুদের বোঝা কমতে শুরু করেছে এবং সরকারের প্রাথমিক বাজেট উদ্বৃত্ত অর্জনের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
সুদের হার কমে আসায় ঋণ ব্যবস্থাপনার খরচও হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখছে।
কাঠামোগত সংকট এখনও অমীমাংসিত
তবে অর্থনীতির গভীর সমস্যাগুলো এখনও রয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে রাজস্ব বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা সমাধান হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে প্রদেশগুলো বড় অঙ্কের অর্থ পেলেও নিজেদের রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে যথেষ্ট উদ্যোগ দেখাচ্ছে না।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার কর আদায়ের দায়িত্ব বহন করলেও রাজস্বের বড় অংশ ভাগ করে দিতে হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জ্বালানি খাতে আরোপিত বিভিন্ন লেভি ও করের ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান উন্নতির বড় অংশ আন্তর্জাতিক আর্থিক কর্মসূচির শর্ত ও নজরদারির কারণে সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এসব সহায়তা ও চাপ একসময় শেষ হয়ে যাবে।
তাই প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন এমন একটি আর্থিক কাঠামো, যেখানে কেন্দ্র ও প্রদেশ উভয়েরই রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্পষ্ট জবাবদিহি থাকবে। একই সঙ্গে করের আওতা বাড়ানো, অকার্যকর ব্যয় কমানো এবং অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নও জরুরি।
পাকিস্তান আপাতত আর্থিক স্বস্তির পথে হাঁটছে। কিন্তু সেই অগ্রগতি স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে কাঠামোগত সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















