মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্ট একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। তবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে আবারও সামরিক হামলা শুরু করা হতে পারে।
বুধবার প্রকাশিত চুক্তির পাঠ অনুযায়ী, দুই দেশ আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাবে। ইরান জানিয়েছে, চুক্তিটি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও পুনর্গঠনের পথ
১৪ দফার এই সমঝোতায় যুদ্ধরত সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল পুনরায় চালু, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার, বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ও রয়েছে।
চুক্তিতে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম কমার প্রবণতা দেখা গেছে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন সমঝোতা
চুক্তির আওতায় ইরান পুনরায় ঘোষণা করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এছাড়া আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ প্রক্রিয়াজাত করার বিষয়েও সম্মত হয়েছে।
তবে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে পারমাণবিক ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের কড়া বার্তা
চুক্তি স্বাক্ষরের পর ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেবে। তবে একই সঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ইরানেরও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করার কথা বলেছিলেন।
জি-৭ নেতাদের সমর্থন
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা লেবাননে অবিলম্বে পূর্ণ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা নয়, লেবাননেও সহিংসতা বন্ধ হওয়া জরুরি।
লেবাননে সংঘাত এখনো পুরোপুরি থামেনি
যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হলেও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে সীমান্ত এলাকায় ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের কয়েকজন সেনা সদস্য আহত হয়েছেন। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
![]()
যুদ্ধের মূল্য
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়। কয়েক মাসের এই সংঘাতে সাত হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব থেকে জানা গেছে। এর বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক।
যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য সরবরাহ সংকটের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। নতুন এই চুক্তি সেই অস্থিরতা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শান্তি প্রক্রিয়ার সূচনা নাকি সাময়িক বিরতি—তা নির্ধারণ করবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনা এবং দুই পক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















