প্রায় চার মাসের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে নতুন দফার আলোচনায় বসতে যাচ্ছে, তখনও সামনে রয়ে গেছে একাধিক জটিল প্রশ্ন। দুই পক্ষের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা উত্তেজনা কমানোর পথ খুলে দিলেও বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ হবে না।
পারমাণবিক কর্মসূচিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন প্রতিশ্রুতি দিলেও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত।
যুক্তরাষ্ট্র চায় এই মজুত হয় ধ্বংস করা হোক, নয়তো দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হোক। অন্যদিকে ইরান তা করতে অনাগ্রহী। তবে ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমানোর বিষয়ে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান।
আরেকটি বড় বিরোধের জায়গা হলো ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পর্যায়ের সমৃদ্ধকরণের দাবি জানিয়ে এলেও ইরান বলছে, এটি তাদের সার্বভৌম অধিকার এবং তা পুরোপুরি ত্যাগ করা সম্ভব নয়।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে টানাপোড়েন
যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। নতুন সমঝোতা অনুযায়ী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ আবার খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র চায় প্রণালিতে বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করতে। কিন্তু ইরান বলছে, তারা এই অঞ্চলের ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ধরে রাখতে চায়। ফলে বিষয়টি ভবিষ্যৎ আলোচনায় নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা ও আটকে থাকা অর্থের প্রশ্ন
ইরান দ্রুত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা বিপুল অর্থ ফেরত চায়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করেই ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে।
তবে তেল বিক্রির কিছু সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হওয়ায় উভয় দেশের রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে অনেকে মনে করছেন, ওয়াশিংটন খুব দ্রুত ছাড় দিচ্ছে।
ইসরায়েল কি নতুন সংকট তৈরি করবে?

আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আলোচনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইসরায়েল স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত কোনো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার দ্বারা সীমাবদ্ধ হবে না।
লেবাননকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে বা সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে চলমান আলোচনা হুমকির মুখে পড়তে পারে। ইরানও আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতিকে চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে চায়।
আলোচনার ধরণেও পার্থক্য
দুই দেশের কূটনৈতিক পদ্ধতির মধ্যেও বড় ফারাক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ফলাফল দেখতে আগ্রহী, আর ইরান সাধারণত দীর্ঘ আলোচনার কৌশল অনুসরণ করে। অতীতেও এই পার্থক্য একাধিক আলোচনাকে ব্যর্থ করেছে।
এ ছাড়া একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনি বিষয়গুলো এতটাই জটিল যে মাত্র দুই মাসের মধ্যে সবকিছু চূড়ান্ত করা কঠিন বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

অবিশ্বাস এখনও বড় বাধা
দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং একাধিক সংঘাতের কারণে দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়ে গেছে। ইরান মনে করে, অতীতের অভিজ্ঞতা তাদের সতর্ক থাকার কারণ দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও সন্দেহ করছে, তেহরান সময়ক্ষেপণের কৌশল নিতে পারে।
এই অবিশ্বাস দূর করা না গেলে বড় ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে। সে ক্ষেত্রে সীমিত চুক্তি কিংবা আলোচনার সময়সীমা বাড়ানোর পথ খোলা থাকতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তেজনা ফিরে আসার ঝুঁকিও থেকে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















