২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ফ্রান্স ও সেনেগালের ম্যাচে যখন আলিরেজা ফাগানি মাঠে নামেন, তখন সেটি ছিল তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় রেফারিং ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইরানে জন্ম নেওয়া এই অভিজ্ঞ রেফারি এবার চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করছেন, যা তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ ম্যাচ কর্মকর্তাদের কাতারে স্থান দিয়েছে।
বিশ্বকাপে দীর্ঘ পথচলা
আলিরেজা ফাগানির বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে ব্রাজিলে। এরপর তিনি রাশিয়া, কাতার এবং এখন উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেও দায়িত্ব পালন করছেন। বছরের পর বছর ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সম্মানিত রেফারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অনেকের মতে, টুর্নামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচ পরিচালনার জন্যও তিনি অন্যতম যোগ্য প্রার্থী।
মাঠে দৃঢ়তা, বিশ্বজুড়ে পরিচিতি
সাধারণত রেফারিদের নাম খুব কমই আলোচনায় আসে। কিন্তু ফাগানি ব্যতিক্রম। এশিয়ান কাপের ফাইনাল, অলিম্পিক ফুটবলের ফাইনাল, ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালসহ বহু বড় ম্যাচ পরিচালনা করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন।
খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ দক্ষতা এবং সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করার মানসিকতা প্রশংসিত হয়েছে বারবার। তবে কোচদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সবসময় সহজ ছিল না। চাপের মুখেও নিজের অবস্থানে অটল থাকার জন্য পরিচিত ফাগানি নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে কখনও দ্বিধা করেননি।
বিতর্কও ছিল ক্যারিয়ারের অংশ
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও পিছু ছাড়েনি। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও আলোচনা হয়েছে। তবে এসব পরিস্থিতি তাঁর পেশাগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারেনি। বরং কঠিন পরিবেশে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা তাঁকে আরও অভিজ্ঞ করেছে।
অস্ট্রেলিয়ায় নতুন অধ্যায়
ইরান ছাড়ার পর ফাগানি অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হন এবং পরবর্তীতে দেশটির আন্তর্জাতিক রেফারি প্যানেলে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক আসরে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন। তবুও অনেক ইরানি সমর্থকের কাছে তিনি এখনও নিজেদেরই একজন।
.jpg)
২০২৫ সালের ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালের পর একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। সেই ঘটনাকে ঘিরে নিজ দেশে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছিল। তবে এসব বিষয়কে পাশ কাটিয়ে তিনি সবসময় নিজের পেশাগত দায়িত্বের প্রতিই মনোযোগী থেকেছেন।
খেলোয়াড় থেকে রেফারি
তেহরানের যুব ফুটবল ব্যবস্থায় একজন খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু রেফারিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তই তাঁর জীবন বদলে দেয়। স্থানীয় মাঠ থেকে শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার গল্পটি আজ অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা।
শেষ অধ্যায়ে উপভোগের চেষ্টা
আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও রেফারিদের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্ব কমেনি বলে মনে করেন ফাগানি। ৪৭ বছর বয়সী এই রেফারি ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান সময়ই হয়তো তাঁর শেষ কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের একটি।

তবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরও তিনি নিজের ভুল স্বীকার করতে পিছপা নন। সমালোচনা ও ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। কঠিন সিদ্ধান্তের জন্য পরিচিত এই রেফারি প্রমাণ করেছেন, শেখার প্রক্রিয়া কখনও শেষ হয় না।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে বারবার দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে রয়েছে তাঁর পেশাদারিত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং নিরপেক্ষতা। সেই কারণেই আলিরেজা ফাগানি আজ শুধু একজন রেফারি নন, বিশ্ব ফুটবলের আস্থার প্রতীক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















