মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগর অঞ্চল বহু দশক ধরে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম অস্থির কেন্দ্র। এখানে জ্বালানি, সামরিক শক্তি, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থ এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে একটি ছোট ঘটনা কখনও কখনও বৃহৎ সংকটে পরিণত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস আবারও দেখিয়েছে যে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো কতটা নড়বড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া পারস্য উপসাগরের জন্য তার সমষ্টিগত নিরাপত্তা ধারণার নতুন সংস্করণ সামনে এনেছে। বিষয়টি শুধু একটি কূটনৈতিক নথি প্রকাশের ঘটনা নয়; বরং এটি এমন এক রাজনৈতিক বার্তা, যেখানে সংকট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে সংকট প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মূল প্রশ্ন হলো, সংঘাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি অঞ্চলে কি সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব?
রাশিয়ার প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বাস্তববাদী চরিত্র। অতীতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে যে ধরনের মহাপরিকল্পনা বা বৃহৎ কাঠামোর কথা বলা হতো, এবার তার পরিবর্তে গুরুত্ব পেয়েছে ছোট কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ। মস্কোর ধারণা, পারস্য উপসাগরে স্থায়ী স্থিতিশীলতা একদিনে আসবে না; বরং তা গড়ে উঠবে ধাপে ধাপে, আস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে।
এ কারণেই নতুন ধারণাপত্রে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখিয়েছে যে বাইরের শক্তির সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রায়ই স্থিতিশীলতা আনার বদলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া কিংবা ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই প্রমাণ।
রাশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো নিরাপত্তার অবিভাজ্যতা। কোনো রাষ্ট্র যদি নিজের নিরাপত্তা জোরদার করতে গিয়ে প্রতিবেশীকে আরও বেশি হুমকির মুখে ঠেলে দেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকে না। পারস্য উপসাগরের মতো একটি অঞ্চলে, যেখানে সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যুদ্ধজাহাজ, ড্রোন ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ঘনভাবে অবস্থান করছে, সেখানে ভুল বোঝাবুঝি বা দুর্ঘটনাজনিত সংঘর্ষের ঝুঁকি সবসময়ই থাকে।
এখানেই রাশিয়ার প্রস্তাবিত ‘প্রতিরোধমূলক কূটনীতি’র গুরুত্ব। সামরিক বাহিনীগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যবেক্ষক বিনিময়, প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ রাজনৈতিক মতভেদ দূর না করলেও ভুল হিসাবের কারণে যুদ্ধের সম্ভাবনা কমাতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এমন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নতুন নয়; বরং শীতল যুদ্ধের সময়ও এ ধরনের ব্যবস্থাই বহুবার বড় সংকট ঠেকাতে সাহায্য করেছে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি বাণিজ্য এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে অস্থিতিশীলতা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। মস্কো মনে করে, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আঞ্চলিক সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটিও উপেক্ষা করা হয়নি। পারস্য উপসাগর দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্রবাজার। উন্নত যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ড্রোন সংগ্রহকে অনেক দেশ জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন হিসেবে দেখে। কিন্তু একই সঙ্গে এসব ক্রয় প্রতিবেশীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে আরও ত্বরান্বিত করে। রাশিয়া এই বাস্তবতার মধ্যেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক ভারসাম্য নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের বিষয়েও মস্কোর অবস্থান লক্ষণীয়। আঞ্চলিক নিরাপত্তা তখনই টেকসই হতে পারে, যখন নিয়মগুলো সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। নির্বাচিত কয়েকটি রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে নীতি নির্ধারণ করলে সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বাড়ে। তাই মধ্যপ্রাচ্যকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রমুক্ত অঞ্চলে পরিণত করার দীর্ঘদিনের ধারণাকে আবারও সামনে আনা হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগের পেছনে কেবল আদর্শবাদী চিন্তা কাজ করছে, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। রাশিয়ার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থও এখানে জড়িত। ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন ভারসাম্য খুঁজতে থাকা মস্কো মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব বজায় রাখতে চায়। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কও রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই নিরাপত্তা প্রস্তাব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি রাশিয়ার বৃহত্তর কূটনৈতিক অবস্থানকেও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা।
তবু উদ্যোগটির মূল্যায়ন করতে হলে এর বাস্তব সম্ভাবনার দিকে তাকাতে হবে। পারস্য উপসাগরের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস এখনো গভীর। বহিরাগত শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাও অব্যাহত। এমন বাস্তবতায় কোনো নতুন নিরাপত্তা কাঠামো দ্রুত কার্যকর হবে, এমন প্রত্যাশা অযৌক্তিক। কিন্তু এ কথাও সত্য যে বারবার একই ধরনের সংকটের পুনরাবৃত্তি কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।
সুতরাং রাশিয়ার প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো এটিই—নিরাপত্তা কেবল সামরিক শক্তির বিষয় নয়; এটি আস্থা, যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বীকৃতিরও প্রশ্ন। পারস্য উপসাগর যদি ভবিষ্যতে সংঘাতের কেন্দ্র থেকে সহযোগিতার অঞ্চলে পরিণত হতে চায়, তাহলে বড় কোনো চুক্তির আগে ছোট ছোট বাস্তব পদক্ষেপই হতে পারে সেই যাত্রার প্রথম ধাপ।
ইভান তিমোফিয়েভ 


















