যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নতুন এই চুক্তির ফলে ইরান যুদ্ধের অবসানের পথ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি চালু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের তেল খাতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার ইঙ্গিত বাজারে সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশা জোরদার করেছে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ শতাংশের বেশি কমে ৭৭ ডলারের নিচে নেমে আসে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ডব্লিউটিআই তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৫ ডলারে নেমে যায়। এর ফলে মার্চের শুরুর দিকের দামের কাছাকাছি অবস্থানে ফিরে এসেছে তেলের বাজার।
চুক্তির মূল বিষয় কী
১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী আগামী ৬০ দিন দুই দেশ আলোচনার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে। এই সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে টোল ছাড়াই জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় নৌযান চলাচল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো আপাতত পরে আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বড় আকারের অর্থায়ন পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
বাজারে সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশা
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, নতুন চুক্তির ফলে বাজারে ইরানি তেলের প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত হতে পারে। সেই সম্ভাবনাই মূলত তেলের দামে চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলেও সরবরাহ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক হারে বাড়বে না। যুদ্ধকালীন সময়ে বিকল্প ব্যবস্থায় কিছু তেল পরিবহন অব্যাহত ছিল। এছাড়া চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক জাহাজ মালিক এখনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা এখনও শক্তিশালী রয়েছে। ফলে সরবরাহ বাড়লেও দাম দ্রুত যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত। অনেক দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকায় জ্বালানির চাহিদাও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন এক সতর্কবার্তাও এসেছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল স্বাভাবিকভাবে বাজারে ফিরতে শুরু করে, তাহলে আগামী বছরগুলোতে বৈশ্বিক বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে তেলের দামের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুদের হারও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
তেলের বাজারে আরেকটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও কঠোর অবস্থান নিলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হতে পারে। এর ফলে জ্বালানির চাহিদাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তির বার্তা দিলেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে চুক্তির বাস্তবায়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথের ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















