বাংলাদেশ সম্প্রতি পদ্মা নদী নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের মৌসুমি পানির সংকট কমানোর লক্ষ্যে নতুন পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। পদ্মা মূলত বাংলাদেশের অংশে প্রবাহিত গঙ্গা নদী। এই প্রকল্পকে দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজে ২,৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষের পানি চাহিদা পূরণে সহায়তা করা হবে। সাত বছর মেয়াদি প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা।
ব্যারাজটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে মাত্র ১৮০ কিলোমিটার ভাটিতে নির্মিত হবে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ মনে করে আসছে, ফারাক্কা ব্যারাজ শুষ্ক মৌসুমে দেশের পানি সংকটের অন্যতম কারণ। ভারতের অন্যতম বৃহৎ এই ব্যারাজটি গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল।
অতীতের চুক্তি, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী, ফারাক্কায় পানিপ্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে এলে বাংলাদেশ অর্ধেক পানি পাওয়ার অধিকারী। তবে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে উভয় দেশকে পর্যায়ক্রমে অন্তত ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
২০১৯ সালে বিশেষজ্ঞদের একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও ১৯৯৭, ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৬ সালে ফারাক্কায় কম পানিপ্রবাহের ঘটনা ঘটেছে। গবেষকদের মতে, নদীর প্রবাহে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় ১৯৯৬ সালের চুক্তি যথেষ্ট নয়।
চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হচ্ছে। এরই মধ্যে তিস্তা নদীসহ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একাধিক নদী-চুক্তি এখনও স্বাক্ষরিত হয়নি।
দক্ষিণ এশিয়া কনসোর্টিয়াম ফর ইন্টারডিসিপ্লিনারি ওয়াটার রিসোর্সেস স্টাডিজের সভাপতি এস. জানাকারাজন বলেন, সীমান্ত অতিক্রমকারী প্রায় সব পানি বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে সময়মতো পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার প্রশ্ন। তার মতে, নতুন ব্যারাজ নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য নিজস্ব জলসম্পদের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করবে।
তবে তিনি সতর্ক করেন, এই সুবিধার জন্য পরিবেশগত মূল্যও দিতে হতে পারে।

ফারাক্কার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
ফারাক্কা ব্যারাজ বাংলাদেশের গঙ্গা অববাহিকার প্রকৃতি ও পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে কৃষি সেচের জন্য।
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ হ্রাস পেয়েছে, নৌপথ সংকুচিত হয়েছে, লবণাক্ততা বেড়েছে, নদীভাঙন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ কমে গেছে।
জানাকারাজনের মতে, বাংলাদেশের একটি বড় অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটারেরও কম উচ্চতায় অবস্থিত। ২০২২ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, আগামী ১৫০ বছরের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে দেশের ১৭ শতাংশ ভূখণ্ড হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং প্রায় ২ কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রতিদিন মাথাপিছু গড়ে ৫২০ লিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হতো। পরিমাণটি খুব বেশি না হলেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর দেশের নির্ভরতা উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফারাক্কার কারণে পদ্মায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদী পলি বহন করার সক্ষমতা হারাচ্ছে। ফলে পলি নদীতলে জমে থাকে এবং বর্ষাকালে দ্রুত বন্যা সৃষ্টি করে।
এই পলিই আবার সুন্দরবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে অপরিহার্য। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা থেকে আসা পানি ও পলির ওপর বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যারাজের কারণে পলি ও মিঠা পানির প্রবাহ কমে গেলে সুন্দরবনের পানিতে লবণাক্ততা বাড়বে। এর ফলে মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং স্থানীয় জেলেদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাঁধ নির্মাণের প্রবণতা
বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বাঁধ নির্মাণের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৩ সালের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলে ১৬০টিরও বেশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণাধীন রয়েছে।
চীন ব্রহ্মপুত্র নদে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণ করছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ২০০টির বেশি বাঁধসহ ৬ দশমিক ৪ লাখ কোটি রুপির জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে শতবর্ষ টিকে থাকার ধারণায় নির্মিত বাঁধগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
ডায়ালগ আর্থের সাবেক দক্ষিণ এশিয়া ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ওমাইর আহমদের মতে, ভারী বৃষ্টির সময় ব্যারাজে অতিরিক্ত পানি জমে গেলে তা নিষ্কাশনের জন্য ব্যাপক খাল ও অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। এসব অবকাঠামো সাধারণত কংক্রিটনির্ভর হয়।
তার ভাষায়, “কংক্রিটের বিশাল জলাধার তৈরি মানে পানি আর ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারবে না। এতে ব্যারাজের আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত হবে।”
বড় প্রকল্প নাকি ছোট সমাধান?
পরিবেশগত ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আরেকটি বড় ব্যারাজ নির্মাণ সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত সমাধান নয়।
ওমাইর আহমদ বলেন, “আমরা প্রায়ই মনে করি বড় প্রকল্পই পানি ব্যবস্থাপনা করবে, অথচ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে তা সব সময় সফল হয় না। প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র এতটাই জটিল যে বড় প্রকল্প দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা কঠিন।”
তিনি এবং জানাকারাজন উভয়েই পরামর্শ দেন, একটি বিশাল ব্যারাজের পরিবর্তে নদীর বিভিন্ন অংশে ছোট ছোট চেক ড্যাম নির্মাণ করা যেতে পারে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে খুব বেশি ব্যাহত করে না।
তবে এর জন্য বিস্তৃত পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন হবে।
ভূরাজনীতি ও চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা
বাংলাদেশের একটি শীর্ষ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৌশল সক্ষমতা বাংলাদেশের একার পক্ষে অর্জন করা কঠিন এবং চীনের সহায়তা থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভারতের সীমান্তের এত কাছে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সাম্প্রতিক জটিলতার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত।
ওমাইর আহমদের মতে, “এতে দক্ষিণ এশিয়ায় পানি ব্যবস্থাপনায় চীন আরও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, যেমনটি মেকং অঞ্চলে হয়েছে। অন্যদিকে ভারত নিজ প্রতিবেশেই তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবশালী হয়ে পড়তে পারে।”
এখন পর্যন্ত ভারত সরকার পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। বাংলাদেশ বলেছে, গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে সমঝোতার ওপরই দুই দেশের সম্পর্কের একটি বড় অংশ নির্ভর করছে। অন্যদিকে ভারত জানিয়েছে, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যেই সব নদী-সংক্রান্ত বিষয়ের সমাধান করা হবে। গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
(দি হিন্দু থেকে অনূদিত)
সোনিকা লোগানাথন 



















