গর্ভাবস্থা একজন নারীর জীবনে আনন্দের সময় হলেও অনেকের জন্য এটি শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন এক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, গর্ভাবস্থায় শরীরের দ্রুত পরিবর্তন, ওজন বৃদ্ধি এবং হরমোনজনিত ওঠানামা অনেক নারীর মধ্যে খাওয়াদাওয়ার মানসিক ব্যাধির পুরোনো সমস্যা ফিরিয়ে আনতে পারে বা নতুন করে এ ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব সমস্যা শনাক্ত হয় না।
শরীরের পরিবর্তন নিয়ে মানসিক চাপ
গর্ভাবস্থায় শরীরের আকৃতির পরিবর্তন অনেক নারীর জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যারা আগে খাওয়াদাওয়ার মানসিক ব্যাধিতে ভুগেছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন পুরোনো উদ্বেগকে আবার জাগিয়ে তুলতে পারে। অনেকেই আয়নায় নিজেকে দেখে অস্বস্তি অনুভব করেন এবং নিজের শরীরকে গ্রহণ করতে হিমশিম খান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভাবস্থার সময় দ্রুত শারীরিক, মানসিক ও হরমোনগত পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করায় এটি অনেক সময় জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে। তবে যথাযথ সহায়তা ও চিকিৎসা পেলে এই সময়টি সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগও তৈরি করতে পারে।
সমস্যাটি যতটা ভাবা হয়, তার চেয়ে বেশি
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ২০ জন গর্ভবতী নারীর মধ্যে প্রায় একজন খাওয়াদাওয়ার মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারেন। কারও ক্ষেত্রে এটি পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো দেখা দেয়।
অনেক নারী সামাজিক সংকোচ, লজ্জা কিংবা অন্যের বিচারভীতির কারণে চিকিৎসা নিতে চান না। ফলে সমস্যাটি দীর্ঘ সময় অজানা থেকে যায়। একই সঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় এ বিষয়ে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না হওয়াও শনাক্তকরণে বাধা সৃষ্টি করে।

মা ও শিশুর স্বাস্থ্যে প্রভাব
গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত ও সুষম খাবার না খেলে মা ও শিশুর উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়া, নির্ধারিত সময়ের আগে প্রসব, গর্ভকালীন জটিলতা এবং শিশুর বিকাশজনিত সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
চিকিৎসকদের মতে, মায়ের অপুষ্টি ভবিষ্যতে সন্তানের স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
সন্তান জন্মের পরও ঝুঁকি থাকে
সমস্যা শুধু গর্ভাবস্থাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সন্তান জন্মের পরের সময়েও অনেক নারী খাওয়াদাওয়ার মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। ঘুমের অভাব, হরমোনের পরিবর্তন এবং দ্রুত আগের শারীরিক গঠনে ফিরে যাওয়ার সামাজিক চাপ এ অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে।
অনেক মা এ সময় তীব্র মানসিক অস্থিরতা, মেজাজের ওঠানামা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যার মুখোমুখি হন। তবে এসব লক্ষণকে অনেক সময় স্বাভাবিক প্রসবোত্তর পরিবর্তন ভেবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
সচেতনতা ও সহানুভূতিশীল সেবার প্রয়োজন
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভাবস্থার বমিভাব বা খাদ্যে অনীহাসহ কিছু সাধারণ উপসর্গ অনেক সময় খাওয়াদাওয়ার মানসিক ব্যাধির লক্ষণকে আড়াল করে দেয়। ফলে চিকিৎসকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে।
তাদের মতে, নিয়মিত স্ক্রিনিং, সংবেদনশীল যোগাযোগ এবং চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত সেবা এই সমস্যার মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সচেতনতা বাড়ানো এবং বিচারহীন সহায়তার পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
গর্ভাবস্থায় খাওয়াদাওয়ার মানসিক ব্যাধি অনেক সময় অদৃশ্য থেকে গেলেও এর প্রভাব হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি। তাই সময়মতো শনাক্তকরণ ও সঠিক সহায়তাই মা ও শিশুর সুস্থতার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
গর্ভাবস্থায় খাওয়াদাওয়ার মানসিক ব্যাধি অনেক সময় শনাক্ত হয় না। এতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যে দেখা দিতে পারে নানা জটিলতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















