বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকের অভ্যন্তরীণ নথি ফাঁস হওয়ার পর প্ল্যাটফর্মটির নকশা ও ব্যবহারকারীদের আচরণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের হাতে আসা এসব নথিতে দেখা যায়, টিকটক নিজেই স্বীকার করেছে যে তাদের প্ল্যাটফর্মে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এর প্রভাব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরেই উদ্বেগ ছিল।
ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, টিকটকের প্রায় এক কোটি ব্যবহারকারী প্রতিদিন এমন মাত্রায় প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেন, যা প্রতিষ্ঠানটির ভাষায় “বস্তুনিষ্ঠভাবে ক্ষতিকর”। এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সেইসব ব্যবহারকারীকে, যারা দিনে ছয় ঘণ্টা বা তার বেশি সময় টিকটকে কাটান।
কিশোরদের রাতভর সক্রিয়তা
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী ব্যবহারকারীদের ১৯ শতাংশ এবং ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ২৫ শতাংশ মধ্যরাত থেকে ভোর ৫টার মধ্যে টিকটকে সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিশোর ঘুমের সময়েও প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করছে।
টিকটকের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারীরা এমন সময়েও অ্যাপ ব্যবহার করছেন যখন তাদের ঘুমিয়ে থাকার কথা। এ সমস্যা শুধু অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এর প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে।
‘কোয়েরসিভ ডিজাইন’ নিয়ে উদ্বেগ
২০২৩ সালের একটি অভ্যন্তরীণ কৌশলপত্রে টিকটকের ব্যবহারিক নকশাকে “কোয়েরসিভ ডিজাইন ট্যাকটিকস” বা ব্যবহারকারীকে আটকে রাখার কৌশল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে অসীম স্ক্রলিং, অবিরাম নোটিফিকেশন এবং ‘স্লট মেশিন’ ধরনের অনিশ্চিত পুরস্কারভিত্তিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে বলা হয়েছে, তরুণ ব্যবহারকারীরা সামাজিক স্বীকৃতি ও প্রতিক্রিয়ার প্রতি বেশি সংবেদনশীল। ফলে তারা সহজেই দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকে এবং নিজেদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে তুলনামূলকভাবে কম সক্ষম।

আসক্তি কমানোর উদ্যোগের সীমিত সাফল্য
অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতে টিকটক বিভিন্ন নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছিল। ২০২২ সালে চালু হওয়া ‘স্ক্রিন টাইম ব্রেক’ সুবিধার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় পর ব্যবহারকারীদের বিরতির পরামর্শ দেওয়া হতো।
তবে অভ্যন্তরীণ গবেষণায় দেখা যায়, অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের মাত্র ০.৬২ শতাংশ এই সুবিধা চালু করেছিল। যাঁরা ব্যবহার করেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও রাতের ব্যবহারে গড়ে মাত্র ৪ শতাংশ এবং দিনের ব্যবহারে ১ শতাংশ হ্রাস দেখা গেছে।
একইভাবে ২০২০ সালে চালু হওয়া ‘ফ্যামিলি পেয়ারিং’ সুবিধা, যার মাধ্যমে অভিভাবকেরা সন্তানের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, ২০২৩ সালে মাত্র ৪ শতাংশ ব্যবহারকারী গ্রহণ করেছিলেন।
কিশোরদের অভিজ্ঞতায় উদ্বেগ
২০২১ সালে পরিচালিত একটি ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় অংশ নেওয়া এক ১৬ বছর বয়সী কিশোরী টিকটক ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে আসক্তির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এটি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাকে।
আরেক ১৪ বছর বয়সী অংশগ্রহণকারী জানান, অতিরিক্ত টিকটক ব্যবহার সময় নষ্ট করে, মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে তোলে এবং অনেক তরুণকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।
রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার সম্প্রতি ১৬ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, যা ২০২৭ সালের শুরুতে কার্যকর হওয়ার কথা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে চলা এক মামলার প্রক্রিয়ায় এসব নথি প্রকাশ্যে আসে। মামলাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের প্ল্যাটফর্মের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানত, কিন্তু পর্যাপ্ত পরিবর্তন আনেনি।
টিকটকের প্রতিক্রিয়া
অভিযোগের জবাবে টিকটক জানিয়েছে, নথিগুলোকে প্রেক্ষাপট ছাড়া উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাদের দাবি, এসব নথি সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা, গবেষণা মূল্যায়ন করা এবং আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির অংশ ছিল।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, গত সাত বছরে তারা প্ল্যাটফর্ম নিরাপত্তায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য ৫০টির বেশি নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট, কনটেন্ট সীমাবদ্ধতা এবং স্ক্রিন টাইম ব্যবস্থাপনা সুবিধা।
টিকটকের ফাঁস হওয়া নথিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা, ব্যবহারকারীর মনস্তত্ত্ব এবং শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বৈশ্বিক বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।
টিকটকের ফাঁস হওয়া নথিতে কিশোরদের আসক্তি, রাতভর ব্যবহার এবং প্ল্যাটফর্মের নকশা নিয়ে নতুন উদ্বেগের তথ্য উঠে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















