০২:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
হাইলাইট: দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে প্রতিদিন, তবে বন্ধ অনুসন্ধান–মামলা সপ্তাহের শুরুতেই সোনার গহনার দাম ভরিতে কমলো ২২১৬ টাকা   শিকারি-সংগ্রাহকদের মধ্যেও ছিল প্লেগ! ৫,৫০০ বছর আগের মহামারির চাঞ্চল্যকর প্রমাণ এল নিনোর নতুন হুমকি: ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী জলবায়ু ঘটনা কি সামনে? গাছেরও আছে ‘গোপন শ্রবণশক্তি’, প্রতিবেশীর খবর শুনেই বদলায় বেড়ে ওঠার কৌশল নেটফ্লিক্সে হারলান কোবেন ঝড়: রহস্য আর পারিবারিক নাটকের জাদুতে বিশ্বজয় বড়দের নতুন ছুটি: গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে ফিরছে প্রাপ্তবয়স্করা অনলাইনের প্রেমে প্রতারণা: একাকীত্বকে পুঁজি করে বাড়ছে ‘লাভ স্ক্যাম’ চক্র অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারে নতুন আশা, জীবন বাড়াতে পারে যুগান্তকারী ওষুধ চকলেটের মিষ্টি রহস্য: কোকো ফলনে ভরসা রক্তচোষা ক্ষুদে পোকা

শুধু পানি নয়, উন্নত রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি জলনিরাপত্তা

একটি দেশের উন্নয়নকে সাধারণত অবকাঠামো, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকে পরিমাপ করা হয়। কিন্তু উন্নয়নের সবচেয়ে মৌলিক শর্তগুলোর একটি হলো নিরাপদ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা। কারণ পানি কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে দেশ তার পানিসম্পদকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে, সে দেশ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জনের সুযোগ পায়।

ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায়, পানি খাতকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হলে বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব। বহু বছর ধরে পানীয় জল, স্যানিটেশন, নদী সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কিংবা বর্জ্যজল ব্যবস্থাপনা আলাদা আলাদা উদ্যোগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার এসব ক্ষেত্র আসলে পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। একটি ক্ষেত্রে সাফল্য অন্য ক্ষেত্রের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই গত এক দশকে ভারতে পানি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ ও নীতিগত সংস্কার দেখা গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ লাখো পরিবারের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছে। একসময় যেসব পরিবার, বিশেষ করে নারীরা, প্রতিদিন দীর্ঘ সময় পানি সংগ্রহে ব্যয় করতেন, তারা এখন সেই সময় শিক্ষা, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড কিংবা পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে পারছেন। নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা জলবাহিত রোগও কমিয়েছে, যার ফলে স্বাস্থ্য খাতে পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যয় হ্রাস পেয়েছে।

পানি নিরাপত্তার সঙ্গে স্যানিটেশনের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা থাকলেও যদি স্যানিটেশন দুর্বল হয়, তবে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে। ভারতের গ্রামীণ স্যানিটেশন কর্মসূচি দেখিয়েছে, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আচরণগত পরিবর্তন ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে বড় পরিসরে সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব। স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো, নারীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে এসব উদ্যোগের প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

Why Water Security is Important for Vikshit Bharat @2047 - Chintan

তবে কেবল পানীয় জল ও স্যানিটেশনই যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে পানিসম্পদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। তাই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, স্থানীয় জলাধার পুনরুদ্ধার এবং ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ এখন আর বিকল্প নয়; এগুলো অপরিহার্য প্রয়োজন।

নদী ব্যবস্থাপনাও এই সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহু দেশের মতো ভারতেও নদীগুলো দীর্ঘদিন শিল্পবর্জ্য, নগরায়ণ এবং অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচি দেখিয়েছে, উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নদীর পরিবেশগত স্বাস্থ্যও উন্নত করা সম্ভব।

আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং টেকসই করা। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ভারতের মতো দেশগুলোতে বাস করলেও তাদের হাতে বৈশ্বিক মিঠা পানির সম্পদের অংশ তুলনামূলকভাবে সীমিত। দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই চাপকে আরও বাড়াবে। ফলে পানির প্রতিটি ফোঁটার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।

এই কারণেই জলনিরাপত্তাকে কেবল একটি খাতভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি কৌশলগত বিষয়। একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন তখনই বাস্তব রূপ পেতে পারে, যখন পানীয় জল, স্যানিটেশন, নদী সংরক্ষণ, বর্জ্যজল পুনর্ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে একই উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

উন্নয়নের পথে পানি কোনো সহায়ক উপাদান নয়; এটি সেই ভিত্তি, যার ওপর টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়।
জনপ্রিয় সংবাদ

হাইলাইট: দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে প্রতিদিন, তবে বন্ধ অনুসন্ধান–মামলা

শুধু পানি নয়, উন্নত রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি জলনিরাপত্তা

০৭:৩৩:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

একটি দেশের উন্নয়নকে সাধারণত অবকাঠামো, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকে পরিমাপ করা হয়। কিন্তু উন্নয়নের সবচেয়ে মৌলিক শর্তগুলোর একটি হলো নিরাপদ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা। কারণ পানি কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে দেশ তার পানিসম্পদকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে, সে দেশ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জনের সুযোগ পায়।

ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায়, পানি খাতকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হলে বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব। বহু বছর ধরে পানীয় জল, স্যানিটেশন, নদী সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কিংবা বর্জ্যজল ব্যবস্থাপনা আলাদা আলাদা উদ্যোগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার এসব ক্ষেত্র আসলে পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। একটি ক্ষেত্রে সাফল্য অন্য ক্ষেত্রের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই গত এক দশকে ভারতে পানি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ ও নীতিগত সংস্কার দেখা গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ লাখো পরিবারের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছে। একসময় যেসব পরিবার, বিশেষ করে নারীরা, প্রতিদিন দীর্ঘ সময় পানি সংগ্রহে ব্যয় করতেন, তারা এখন সেই সময় শিক্ষা, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড কিংবা পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে পারছেন। নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা জলবাহিত রোগও কমিয়েছে, যার ফলে স্বাস্থ্য খাতে পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যয় হ্রাস পেয়েছে।

পানি নিরাপত্তার সঙ্গে স্যানিটেশনের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা থাকলেও যদি স্যানিটেশন দুর্বল হয়, তবে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে। ভারতের গ্রামীণ স্যানিটেশন কর্মসূচি দেখিয়েছে, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আচরণগত পরিবর্তন ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে বড় পরিসরে সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব। স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো, নারীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে এসব উদ্যোগের প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

Why Water Security is Important for Vikshit Bharat @2047 - Chintan

তবে কেবল পানীয় জল ও স্যানিটেশনই যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে পানিসম্পদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। তাই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, স্থানীয় জলাধার পুনরুদ্ধার এবং ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ এখন আর বিকল্প নয়; এগুলো অপরিহার্য প্রয়োজন।

নদী ব্যবস্থাপনাও এই সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহু দেশের মতো ভারতেও নদীগুলো দীর্ঘদিন শিল্পবর্জ্য, নগরায়ণ এবং অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচি দেখিয়েছে, উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নদীর পরিবেশগত স্বাস্থ্যও উন্নত করা সম্ভব।

আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং টেকসই করা। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ভারতের মতো দেশগুলোতে বাস করলেও তাদের হাতে বৈশ্বিক মিঠা পানির সম্পদের অংশ তুলনামূলকভাবে সীমিত। দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই চাপকে আরও বাড়াবে। ফলে পানির প্রতিটি ফোঁটার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।

এই কারণেই জলনিরাপত্তাকে কেবল একটি খাতভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি কৌশলগত বিষয়। একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন তখনই বাস্তব রূপ পেতে পারে, যখন পানীয় জল, স্যানিটেশন, নদী সংরক্ষণ, বর্জ্যজল পুনর্ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে একই উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

উন্নয়নের পথে পানি কোনো সহায়ক উপাদান নয়; এটি সেই ভিত্তি, যার ওপর টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়।