যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকায় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির পর জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত পাওয়ায় ব্যাংকটি আপাতত অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের কৌশল বেছে নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের নয় সদস্যের মনিটারি পলিসি কমিটি (এমপিসি) ৭-২ ভোটে নীতিগত সুদহার ৩.৭৫ শতাংশে বহাল রাখে। বাজার বিশ্লেষকদের বড় অংশই এমন সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে স্বস্তির ইঙ্গিত
সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ২.৮ শতাংশে স্থির ছিল। এটি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কম। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতির সর্বোচ্চ হার ৩.২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে নতুন পূর্বাভাস দিয়েছে, যা এপ্রিলের পূর্বাভাসের তুলনায় নিচে।
ব্যাংকের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ঘোষণার পর তেলের দামে যে পতন দেখা গেছে, তা উৎসাহব্যঞ্জক। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কয়েক মাস ধরে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারের আশপাশে থাকায় মূল্যস্ফীতির কিছু চাপ এখনো অর্থনীতিতে রয়ে গেছে।
তার ভাষায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যে এই চাপ দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিতে রূপ না নেয় এবং মূল্যস্ফীতি যেন ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি ফিরে আসে।
অর্থনীতির গতি কমছে
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মে মাসে দেশটির জিডিপি ০.১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে চাকরির শূন্যপদের সংখ্যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
মজুরি বৃদ্ধির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। শ্রমবাজারের এই শীতল প্রবণতাই নীতিনির্ধারকদের সতর্ক অবস্থান নেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জ্বালানি সংকট ও বন্ডবাজারের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরুর পর গত প্রায় চার মাসে যুক্তরাজ্যের সরকারি বন্ডের সুদহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মূল্যস্ফীতিকে বাড়াতে পারে।
তবে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মতে, বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি নিজেই পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ গ্রহণকে ব্যয়বহুল করে তুলছে, যা অর্থনীতিতে চাহিদা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছে। এ কারণে আপাতত নীতিগত সুদহার আরও বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা যাচ্ছে না।
এমপিসির ভেতরে মতভেদ
যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে ছিলেন, দুই সদস্য—প্রধান অর্থনীতিবিদ হিউ পিল এবং বহিরাগত সদস্য মেগান গ্রিন—সুদহার ০.২৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করার পক্ষে ভোট দেন।
হিউ পিলের আশঙ্কা, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে কর্মীরা বেশি মজুরি দাবি করতে পারেন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই ব্যয় পণ্যের দামে চাপিয়ে দিতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় দফার চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের এই সিদ্ধান্তের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভও সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি মাসের শুরুতে প্রায় তিন বছর পর প্রথমবারের মতো সুদহার বাড়িয়ে ২.২৫ শতাংশ করেছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি বাজার এবং প্রবৃদ্ধির অনিশ্চয়তা এখনো বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকলেও, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পথেই এগোচ্ছে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদহার ৩.৭৫ শতাংশে বহাল রেখেছে, মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসও কমিয়েছে। অর্থনীতির দুর্বলতা ও জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















