ভারতের বিস্তীর্ণ সমতল ও মরু অঞ্চলে গ্রীষ্মের তাপদাহ দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। বছরের পর বছর তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় মানুষকে জীবনযাত্রা বদলাতে হচ্ছে, কাজের সময়সূচি পাল্টাতে হচ্ছে এবং নতুন নতুন উপায়ে গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
রাজস্থানের মরু শহর জয়সালমেরের উপকণ্ঠে সানওয়াতা গ্রামের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী পশুপালক সাওয়াই ভাটি সিং বলেন, আগে যেসব পদ্ধতিতে গরম মোকাবিলা করা যেত, এখন সেগুলো আর তেমন কার্যকর নয়। প্রতি বছরই তাপমাত্রা বাড়ছে, ফলে জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সিংয়ের পরিবার পুরু পাথরের দেয়াল ও কম জানালাযুক্ত ঘরে বসবাস করে, যা কিছুটা তাপ আটকাতে সাহায্য করে। তবে তীব্র গরমের দিনে ঘরের ভেতরও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়। জুনের শুরুতেই তাদের এলাকায় তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। অতীতে সেখানে সর্বোচ্চ ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাও রেকর্ড করা হয়েছে।
পরিবার ও গবাদিপশুর ওপর প্রভাব
অতিরিক্ত গরমে শুধু মানুষ নয়, গবাদিপশুও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সিং জানান, ছাগল ও গরুগুলো দিনের বেশিরভাগ সময় ছায়ায় কাটায়। গরমের কারণে তাদের খাদ্য গ্রহণ কমে যায়, ফলে দুধ উৎপাদনও কমে যাচ্ছে।
দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তিনি। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করেন। অন্যদিকে রান্নাঘরে কাঠের চুলায় রান্না করতে গিয়ে তার স্ত্রী ও মাকেও চরম কষ্ট সহ্য করতে হয়।
গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পরিবারটি কূপের পানি সংগ্রহ করে বিশেষভাবে মোড়ানো বোতলে সংরক্ষণ করে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে। পাশাপাশি গত বছর প্রথমবারের মতো তারা একটি এয়ার কুলার কিনেছে। এ বছর সেটির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে দুটি।

নগর ও গ্রামে একই সংকট
রাজস্থানের মরু অঞ্চলের মতো রাজধানী নয়াদিল্লির কাছাকাছি যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকাতেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে। সেখানে বসবাসকারী কৃষক ভোলে শঙ্কর জানান, নদীর তীরবর্তী খোলা পরিবেশ তুলনামূলক ঠান্ডা হলেও অনেক সময় দিন ও রাতের তাপমাত্রার মধ্যে তেমন পার্থক্য থাকে না।
চলতি গ্রীষ্মে দিল্লিতে তাপমাত্রা ৪৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। যদিও এটি আগের বছরের রেকর্ডের নিচে, তবু মানুষের কষ্ট কমেনি।
শঙ্কর ও তার পরিবার বিদ্যুৎ সংযোগবিহীন একটি অস্থায়ী ঘরে বাস করেন। একটি ছোট সৌর প্যানেলের সাহায্যে তারা একটি পাখা চালান। তবে সেটি গরম বাতাসই ঘুরিয়ে দেয়।
বদলে যাচ্ছে কাজের সময়
তীব্র গরমের কারণে অনেক কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ এখন ভোরের আগেই কাজ শুরু করছেন। দুপুরের প্রখর রোদে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যার দিকে আবার কাজে ফিরছেন। শঙ্করের পরিবারও একই পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
রাতের বেলায় ঘরের দেয়াল খুলে দিয়ে ও দড়ির খাটে ঘুমিয়ে তারা কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারপরও প্রতি বছর গরম যেন আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণাগুলো বলছে, তাপপ্রবাহ এখন আগের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হচ্ছে। ফলে ভারতের কোটি কোটি মানুষকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। গরম আর শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি এখন মানুষের জীবনযাপন, স্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরমের কারণে মানুষ ও গবাদিপশুর জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে। বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীবিকার চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















