বিশ্বজুড়ে গাঁজা বা ক্যানাবিসের ব্যবহার বাড়ছে দ্রুত। বিশেষ করে বৈধতা সম্প্রসারণ, উচ্চমাত্রার THC-সমৃদ্ধ নতুন পণ্য এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের প্রবণতা গবেষকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—মস্তিষ্কের জন্য কতটা গাঁজা অতিরিক্ত?
সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক গবেষণা ও পর্যালোচনায় গাঁজার মস্তিষ্কগত প্রভাব সম্পর্কে নতুন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। এসব গবেষণা দেখাচ্ছে, গাঁজার প্রভাব নির্ভর করে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর—ব্যবহারের ঘনত্ব, ব্যবহারকারীর বয়স এবং পণ্যের শক্তি বা THC-এর মাত্রা।
উচ্চমাত্রার THC নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে বাজারে থাকা গাঁজার THC-এর মাত্রা ছিল তুলনামূলক কম। বর্তমানে অনেক বাণিজ্যিক পণ্যে THC-এর পরিমাণ ২০ শতাংশের বেশি, আর ভ্যাপ কার্টিজ, ওয়াক্স বা ‘ড্যাব’-এর মতো ঘনীভূত পণ্যে তা ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।
গবেষকেরা বলছেন, উচ্চমাত্রার THC মস্তিষ্কে ডোপামিনের প্রবাহ বাড়াতে পারে এবং বাস্তবতা উপলব্ধি ও মনোযোগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে। কিছু গবেষণায় নিয়মিত উচ্চক্ষমতার গাঁজা ব্যবহারের সঙ্গে স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের সংযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
মানসিক স্বাস্থ্যে উপকারের দাবিতে প্রশ্ন
অনেকেই উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা বা ব্যথা কমানোর উদ্দেশ্যে গাঁজা ব্যবহার করেন। তবে সাম্প্রতিক দুটি বড় গবেষণা এই ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করেনি।
একটি গবেষণায় PTSD, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ADHD ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে গাঁজার কার্যকারিতার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং গবেষকেরা সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন। অন্য একটি বিশ্লেষণে কিছু ক্ষেত্রে সীমিত ইতিবাচক ফল মিললেও প্রমাণের মানকে দুর্বল বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রভাব ভিন্ন হতে পারে
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মধ্যবয়স্ক বা বয়স্কদের ক্ষেত্রে মাঝারি মাত্রার গাঁজা ব্যবহার আগের ধারণার মতো ব্যাপক জ্ঞানীয় অবনতি ঘটায় না।
একটি গবেষণায় এক বছরের পর্যবেক্ষণে মাঝারি ব্যবহারকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মানসিক সক্ষমতা হ্রাসের প্রমাণ মেলেনি। তবে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা তুলনামূলক কম শক্তির পণ্য ব্যবহার করতেন এবং প্রতিদিন ব্যবহার করতেন না।
তরুণদের মস্তিষ্ক বেশি ঝুঁকিতে
গবেষণাগুলোর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো কিশোর ও তরুণদের ক্ষেত্রে গাঁজার সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব।
১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার কিশোর-কিশোরীকে অনুসরণ করে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গাঁজা ব্যবহারের সঙ্গে পরবর্তী জীবনে সাইকোটিক ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া অল্প বয়সে গাঁজা ব্যবহার মস্তিষ্কের সাদা পদার্থ বা হোয়াইট ম্যাটারের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিরতি নিলে কিছু উন্নতি সম্ভব
কিছু গবেষণা আশাব্যঞ্জক তথ্যও দিয়েছে। নিয়মিত ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট সময় গাঁজা থেকে বিরত থাকলে মনোযোগ ও কার্যকর স্মৃতির মতো কিছু জ্ঞানীয় ক্ষমতার উন্নতি হতে পারে।
বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় মাত্র দুই সপ্তাহের বিরতির পরও মনোযোগ বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা গেছে। মস্তিষ্কের সংযোগ ব্যবস্থার কিছু পরিবর্তনও সময়ের সঙ্গে আংশিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
বয়স্কদের মস্তিষ্ক সুরক্ষায় সম্ভাবনার ইঙ্গিত
গবেষকেরা ক্যানাবিনল (CBN) নামে একটি যৌগ নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, যা THC পুরোনো হওয়ার পর তৈরি হয়। পরীক্ষাগারে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এটি কোষের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া রক্ষা এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এ গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং মানুষের ক্ষেত্রে এটি আলঝেইমার বা পারকিনসন রোগ প্রতিরোধ করতে পারে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনও আসেনি।
সীমা নির্ধারণই হতে পারে মূল চাবিকাঠি
গবেষকদের মতে, সমস্যাজনক ব্যবহার এড়াতে শুধু কতটা গাঁজা ব্যবহার করা হচ্ছে তা নয়, বরং কখন, কোথায় এবং কেন ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কাজ, পড়াশোনা বা গাড়ি চালানোর আগে গাঁজা ব্যবহার না করার মতো ব্যক্তিগত নিয়ম মেনে চলেন, তাদের মধ্যে সমস্যাজনক ব্যবহারের প্রবণতা কম। গবেষকদের মতে, বৈধ গাঁজার যুগে জনস্বাস্থ্য শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোই ঝুঁকি কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে।
গাঁজার নতুন গবেষণা: মস্তিষ্কের ঝুঁকি ও সম্ভাবনার সাত গুরুত্বপূর্ণ দিক
গাঁজার প্রভাব বয়স, ব্যবহারের মাত্রা ও THC-এর শক্তির ওপর নির্ভর করে—নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই চিত্র।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















