বিশ্বের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মানচিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। এক সময় যে ক্ষেত্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তার অনেকগুলোতেই এখন নতুন শক্তির উত্থান দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ প্রযুক্তি কিংবা উন্নত উৎপাদনের পাশাপাশি জৈবপ্রযুক্তি এখন সেই তালিকার শীর্ষে। বিশেষ করে ক্যানসার গবেষণা ও ওষুধ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে চীনের সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখিয়ে দিয়েছে যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ আর কেবল পশ্চিমা বিশ্বের হাতে সীমাবদ্ধ নয়।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে একটি সম্পূর্ণ চীনা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এটি কেবল একটি ওষুধের সাফল্যের গল্প নয়; বরং বিশ্বব্যাপী উদ্ভাবনের কেন্দ্র কোথায় সরে যাচ্ছে, তারও ইঙ্গিত। বহু বছর ধরে চীনকে দেখা হতো উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি হিসেবে—যে দেশ অন্যের উদ্ভাবন অনুসরণ করে। কিন্তু আজ সেই দেশ নিজস্ব গবেষণা, পেটেন্ট, ওষুধ এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার মাধ্যমে নতুন মানদণ্ড তৈরি করছে।
এই পরিবর্তন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা নয়, ভারতের জন্যও গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়। কারণ জৈবপ্রযুক্তির যে প্রতিযোগিতা আজ দৃশ্যমান, তাতে ভারতের অনেক আগেই শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছানোর কথা ছিল।
ভারতের শক্তি কোথায়?
ভারতের হাতে এমন কিছু সম্পদ রয়েছে, যা বিশ্বের খুব কম দেশের আছে। এখানে উচ্চমানের বিজ্ঞানী, দক্ষ চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং বিপুল রোগীভিত্তিক তথ্যভান্ডার রয়েছে। রোগের ধরন, জিনগত বৈচিত্র্য, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশগত প্রভাব—সব মিলিয়ে ভারত এমন এক গবেষণাক্ষেত্র, যা বৈশ্বিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য অসাধারণ মূল্যবান হতে পারে।
তবু বাস্তবতা হলো, ভারতের জীবনবিজ্ঞান খাতের বড় অংশ এখনও অন্যের জন্য কাজ করার মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি। বহু গবেষক আন্তর্জাতিক প্রকল্পে তথ্য সংগ্রহ করেন, কিন্তু গবেষণার নকশা, মেধাস্বত্ব এবং বাণিজ্যিক লাভের মালিকানা থাকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলস্বরূপ ভারত জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী সহযোগীতে পরিণত হয়।
এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের উদ্ভাবনী শক্তিকে সীমাবদ্ধ করে। কারণ প্রকৃত মূল্য তৈরি হয় নতুন ধারণা, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন মেধাস্বত্ব থেকে; কেবল উৎপাদন বা সেবা প্রদান থেকে নয়।
তথ্যই হতে পারে ভারতের সবচেয়ে বড় সম্পদ
বর্তমান যুগে তথ্য নতুন ধরনের কাঁচামাল। ভারতের জনসংখ্যাগত বৈচিত্র্য, রোগের বিস্তার এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিপুল তথ্য এমন এক সম্পদ, যা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায় ভারত অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় মানবসমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। এই বাস্তবতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিকিৎসা গবেষণার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যদি দায়িত্বশীল ও নিরাপদ পদ্ধতিতে এই তথ্য ব্যবহার করা যায়, তাহলে ভারতের ডেটাভিত্তিক গবেষণা বৈশ্বিক চিকিৎসা উদ্ভাবনের নতুন মান তৈরি করতে পারে।
এর পাশাপাশি, ভারত এখনও এমন একটি অবস্থানে রয়েছে যেখানে পুরোনো ও জটিল নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বোঝা ছাড়াই আধুনিক গবেষণা-ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। দ্রুততর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, গবেষণা-সমর্থক নীতিমালা এবং উদ্ভাবনবান্ধব নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করা গেলে গবেষণাগার থেকে রোগীর কাছে নতুন প্রযুক্তি পৌঁছানোর সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
অনুকরণ নয়, উদ্ভাবনের অর্থনীতি
ভারত দীর্ঘদিন ধরে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও কম খরচে সমাধান তৈরির জন্য প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু আগামী যুগে শুধু দক্ষ বাস্তবায়ন যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন মৌলিক উদ্ভাবন।
দেশের শীর্ষ প্রযুক্তি ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। প্রকৌশলী, চিকিৎসক, জীববিজ্ঞানী, তথ্যবিজ্ঞানী এবং উদ্যোক্তাদের একই গবেষণা পরিবেশে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। পাশাপাশি মেধাবী গবেষকদের জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দিতে হবে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন চিন্তা দরকার। ভারতীয় উদ্ভাবনকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল না রেখে দেশীয় পুঁজি ও কৌশলগত সহায়তার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে। বিদেশে কর্মরত ভারতীয় বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তাদেরও শুধু উপদেষ্টা হিসেবে নয়, বরং সক্রিয় অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার সময় এসেছে।
একটি নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে
ভারতে ইতোমধ্যেই কিছু প্রতিষ্ঠান দেখিয়েছে যে বিশ্বমানের জৈবপ্রযুক্তি উদ্ভাবন সম্ভব। কিন্তু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সাফল্য দিয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জন করা যায় না। প্রয়োজন শত শত উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান, যারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করবে এবং নতুন মেধাস্বত্ব সৃষ্টি করবে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে বলা হয়েছে “বিশ্বের ফার্মেসি”। অর্থাৎ সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ উৎপাদনের কেন্দ্র। কিন্তু আগামী কয়েক দশকে লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও বড়—বিশ্বের চিকিৎসা উদ্ভাবনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠা।
চীন দেখিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রের সমর্থন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে কাজ করলে কী সম্ভব। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বুঝতে শুরু করেছে যে তার দীর্ঘদিনের আধিপত্য আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত নয়। এই পরিবর্তনের মুহূর্তে ভারতের সামনে বিরল এক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিভা, জনসংখ্যার পরিসর, বৈচিত্র্য, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক উন্মুক্ততা—সবকিছুই ভারতের পক্ষে রয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই: দেশটি কি অন্যের উদ্ভাবনের অনুসারী হয়ে থাকবে, নাকি আগামী প্রজন্মের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেবে?
বিবেক ওয়াধওয়া 


















