অস্ট্রেলিয়ায় ক্রীড়াভিত্তিক বাজির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। তবে এবার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। দেশটির সরকার টেলিভিশন, রেডিও, স্টেডিয়াম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্রীড়া বাজির বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সরকারের দাবি, শিশু-কিশোরদের মধ্যে বাজিকে স্বাভাবিক বিনোদন হিসেবে গড়ে ওঠা থেকে রক্ষা করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
দেশটিতে জুয়া ও বাজির অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ানরা সব ধরনের জুয়ায় মোট ৩২.২ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার হারিয়েছেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান এইচ২ গ্যাম্বলিং ক্যাপিটালের হিসাবে, ২০২৫ সালে একজন প্রাপ্তবয়স্ক অস্ট্রেলিয়ানের গড় বার্ষিক ক্ষতি ছিল ১,১৯৮ ডলার, যা বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
খেলার সঙ্গে বাজির ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক
গত দুই দশকে অস্ট্রেলিয়ায় অ-ঘোড়দৌড়ভিত্তিক ক্রীড়া বাজির বাজার দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে স্মার্টফোন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। এক জরিপে দেখা গেছে, গত বছর যারা ক্রীড়া বাজিতে অংশ নিয়েছেন, তাদের প্রায় ৮৯ শতাংশই অনলাইনে বাজি ধরেছেন। একই সঙ্গে পুরুষদের মধ্যে ক্রীড়া বাজিতে অংশগ্রহণও গত সাত বছরে ৫৭ শতাংশ বেড়েছে।
বিজ্ঞাপনগুলোতে সাধারণত তরুণ পুরুষদের দলবদ্ধভাবে বাজি উপভোগ করতে দেখা যায়। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের প্রচারণা তরুণদের কাছে বাজিকে সামাজিক ও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করছে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক শিশুও এখন খেলাধুলা ও বাজিকে একই অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
সরকারের নতুন পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সরকার আগামী জানুয়ারি থেকে নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করতে চায়। প্রস্তাব অনুযায়ী সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত টেলিভিশনে প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ তিনটি বাজির বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে। সরাসরি খেলাধুলার সম্প্রচারের সময় এসব বিজ্ঞাপন পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে। এছাড়া বিজ্ঞাপনে কোনো ক্রীড়াবিদ, সেলিব্রিটি বা বাজির সম্ভাব্য অডস দেখানো যাবে না।
রেডিওতে স্কুলে যাওয়া ও ফেরার ব্যস্ত সময়ে বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ থাকবে। স্টেডিয়ামে কিংবা খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের পোশাকে বাজি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড প্রচারও নিষিদ্ধ করা হবে। অনলাইনে বিজ্ঞাপন কেবল লগইন করা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের কাছেই দেখানো যাবে।

সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা
তবে এই পরিকল্পনা অনেকের কাছে যথেষ্ট নয়। সংসদ সদস্য, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং আসক্তি বিরোধী সংগঠনগুলো বলছে, সরকার মূল সমস্যার সামান্য অংশকে স্পর্শ করেছে মাত্র। ২০২৩ সালের একটি সংসদীয় তদন্ত প্রতিবেদনে বাজির বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ এবং বোনাস অফার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন পরিকল্পনায় সেই সুপারিশগুলোর অধিকাংশই অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
সরকারের নিজস্ব বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বিধিনিষেধ কার্যকর হলে বার্ষিক ক্রীড়া বাজি মাত্র ০.৮ শতাংশ কমতে পারে। সমালোচকদের মতে, এতে আসক্তির হার কমানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে না।
আসক্তি ও সামাজিক ক্ষতির বাস্তবতা
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রীড়া বাজি শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং গৃহস্থালি সহিংসতার মতো সামাজিক ক্ষতির সঙ্গেও জড়িত। অনেক সাবেক আসক্ত অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন বুকমেকার প্রতিষ্ঠান বোনাস, ফ্রি বেট এবং বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে গ্রাহকদের বারবার বাজিতে ফিরিয়ে আনে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের অর্থ হারানো গ্রাহকদের জন্য আলাদা প্রণোদনার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন সীমিত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাজি শিল্পের বিপণন কৌশল, গ্রাহক তথ্য ব্যবহারের ধরন এবং অনলাইন প্রচারণার ওপর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়ায় ক্রীড়া ও বাজির সম্পর্ক কতটা দূরে সরানো সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় ক্রীড়া বাজির বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ, তবে আসক্তি রোধে এর কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















