মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর পরিকল্পনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর হলেও এর প্রভাব থেকে দ্রুত মুক্তি মিলবে না। জ্বালানি সরবরাহে সৃষ্ট ব্যাঘাত, উৎপাদন ব্যবস্থার ক্ষতি এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির পূর্ণ পুনরুদ্ধারে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছিল। এখন পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হলেও সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি। অনেক এলাকায় সমুদ্রপথ নিরাপদ করতে মাইন অপসারণের কাজ বাকি রয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া তেলক্ষেত্র ও শোধনাগারগুলোকে আবার পুরো সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।
অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলতে থাকায় আন্তর্জাতিক পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সতর্কতা বজায় রয়েছে। ফলে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলেও ব্যবসায়িক আস্থার পুনরুদ্ধার ধীরগতির হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণালি পুনরায় চালু হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে ইতোমধ্যে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তা এড়ানো সম্ভব নয়। যুদ্ধকালীন অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর একটি স্থায়ী চাপ তৈরি করেছে, যার প্রভাব আগামী মাসগুলোতেও অনুভূত হতে পারে।
মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত
স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা হচ্ছে মূল্যস্ফীতিকে। যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলেও শান্তি চুক্তির পর তা কিছুটা কমেছে। এতে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ে কিছুটা স্বস্তি এসেছে।
তবে খাদ্যপণ্য ও বিদ্যুতের মতো খাতে উচ্চ জ্বালানি মূল্যের প্রভাব সাধারণত দেরিতে পৌঁছায়। ফলে আগামী কয়েক মাসে এসব খাতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর খাদ্যদ্রব্যের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। একইভাবে অনেক দেশে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও নিয়ন্ত্রিত মূল্যব্যবস্থার কারণে বিদ্যুতের বিলও ধীরে ধীরে সমন্বয় হয়।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় নতুন গুরুত্ব
হরমুজ সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতির আরেকটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। অনেক দেশ এখন মুক্ত বাণিজ্যের চেয়ে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন সরকার জ্বালানি মজুত বাড়ানো, দেশীয় উৎপাদন জোরদার করা এবং সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
এতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বদলে কৌশলগত প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রভাবকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়তে পারে।

প্রবৃদ্ধি টিকে আছে
সংকটের মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি কার্যক্রমের সম্প্রসারণ অনেক দেশের প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করেছে। যদিও মূল্যস্ফীতি ভোক্তাদের ব্যয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, তবু বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। এটি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় সামান্য কম হলেও বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, হরমুজ সংকটের ক্ষত পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে এবং বাজারে আস্থা ফিরতে এখনো সময় প্রয়োজন।
সংকট কমলেও বিশ্ব অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জ শেষ হয়নি। জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার প্রভাব আগামী মাসগুলোতে অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্ব অর্থনীতি বড় মন্দা এড়ালেও হরমুজ সংকটের প্রভাব রয়ে গেছে। জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও বাণিজ্যে স্বাভাবিকতা ফিরতে লাগতে পারে আরও কয়েক মাস।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















