পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল আবাসস্থলগুলোর একটি হলো গভীর সমুদ্র। সূর্যের আলোহীন, হিমশীতল এবং প্রচণ্ড চাপপূর্ণ এই পরিবেশে খাবারের জোগানও অত্যন্ত অনিশ্চিত। অথচ সেখানে বসবাসকারী কিছু প্রাণী টানা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় না খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, গভীর সমুদ্রের আইসোপড নামের এক ধরনের ক্রাস্টেশিয়ান কীভাবে এই বিস্ময়কর ক্ষমতা অর্জন করেছে।
চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব ওশেনোলজির গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি সম্প্রতি সেল সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রাণীদের বেঁচে থাকার কৌশল শুধু শরীরের গঠন নয়, জিনগত অভিযোজনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
অন্ধকারের মরুভূমিতে জীবন
গভীর সমুদ্রের তলদেশকে গবেষকরা তুলনা করেছেন এক ধরনের ‘অন্ধকার মরুভূমি’র সঙ্গে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মৃত জৈব পদার্থের ক্ষুদ্র কণা ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে, যা সেখানে বসবাসকারী প্রাণীদের প্রধান খাদ্য উৎস। কিন্তু এই খাদ্য সরবরাহ এতটাই অনিয়মিত যে একটি বড় খাবারের পর পরবর্তী খাবার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এই কঠিন বাস্তবতায় অভিযোজিত হয়েছে গভীর সমুদ্রের আইসোপড। এদের শরীর চ্যাপ্টা ও খণ্ডিত, রয়েছে ১৪টি সংযুক্ত পা এবং শক্ত বহিঃকঙ্কাল। আটলান্টিক, প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন গভীরতায় এদের দেখা যায়। কিছু প্রজাতির দৈর্ঘ্য অর্ধমিটারেরও বেশি।
বড় পেট, ধীর বিপাক
গবেষণায় দুটি প্রজাতির ওপর বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়েছে—Bathynomus doederleini এবং Bathynomus jamesi। এর মধ্যে দ্বিতীয়টি আরও গভীর সমুদ্রে বাস করে।
গবেষকদের মতে, গভীর পানির এই প্রজাতির পেট শরীরের অভ্যন্তরীণ গহ্বরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা দখল করে। ফলে খাবার পাওয়া গেলে তারা বিপুল পরিমাণ খাদ্য জমা রাখতে পারে। পরে ধীরে ধীরে সেই খাদ্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করে দীর্ঘ সময় টিকে থাকে।
একই সঙ্গে এদের বিপাকক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। হজম প্রক্রিয়া ধীরে চলে এবং শরীর পুষ্টি ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ। ফলে একটি বড় খাবার থেকেই বছরের পর বছর শক্তির জোগান পাওয়া সম্ভব হয়।

ব্যাকটেরিয়া ও জিনের ভূমিকা
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আইসোপডের শরীরে থাকা কিছু অণুজীবও তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করে। বিশেষ করে Chlamydiae নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া চর্বি সঞ্চয়ে ভূমিকা রাখতে পারে। এতে প্রাণীটি দীর্ঘমেয়াদি শক্তির উৎস পায়, আর ব্যাকটেরিয়াও নিরাপদ আবাস লাভ করে।
এ ছাড়া গবেষকরা ND1 নামের একটি বিশেষ জিন শনাক্ত করেছেন, যা সম্ভবত অতীতে কোনো সহাবস্থানকারী ব্যাকটেরিয়া থেকে প্রাণীটির জিনোমে যুক্ত হয়েছে। ‘হরাইজন্টাল জিন ট্রান্সফার’ নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়ায় ভিন্ন প্রজাতির জীবের মধ্যে ডিএনএ স্থানান্তর ঘটে।
গবেষকদের মতে, এই জিন শক্তি উৎপাদন ও ব্যবহারের গতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এটি বিপাকক্রিয়া বাড়াতে পারে, আবার ঠান্ডা পরিবেশে শক্তি সাশ্রয় করে দীর্ঘ সময় অনাহারে বেঁচে থাকার সক্ষমতা বাড়ায়।
ভবিষ্যৎ গবেষণার সম্ভাবনা
জীবিত অবস্থায় গভীর সমুদ্রের আইসোপড নিয়ে গবেষণা করা কঠিন হওয়ায় বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে জেব্রাফিশ, কৃমি এবং মানব কোষে ND1 জিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন। ফলাফল দেখিয়েছে, এটি পরিবেশ অনুযায়ী শক্তি ব্যবহারের গতি বাড়ানো বা কমানোর এক ধরনের জৈব সুইচ হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষকদের মতে, গভীর সমুদ্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবন্ত আবাসস্থল। সেখানে প্রাণীদের বিবর্তনগত অভিযোজন শুধু জীববিজ্ঞানের নতুন দিগন্তই উন্মোচন করছে না, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞান, রোবোটিকস এবং সংরক্ষণবিষয়ক গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে। পাশাপাশি খাদ্য সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জীবজগতের সহনশীলতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে।
পাঁচ বছর না খেয়েও বেঁচে থাকা গভীর সমুদ্রের আইসোপডের রহস্য উন্মোচন করেছে নতুন গবেষণা। বিশাল পেট, ধীর বিপাক ও বিশেষ জিন তাদের টিকে থাকতে সহায়তা করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















