০১:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
বিশ্ববাজারে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁর রেটিংয়ে কতটা ভরসা করবেন? মিশেলিন ও ‘৫০ বেস্ট’ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন জন ক্রিচ যুদ্ধজাহাজকে ছাপিয়ে আকাশের শক্তি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কীভাবে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী সমুদ্রের রাজা হয়ে উঠল এক শতাব্দীর যুদ্ধ-ইতিহাসে মার্কিন ৮২তম এয়ারবর্ন: যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দুর্যোগ মোকাবিলা হিটলার কি সত্যিই সমাজতন্ত্রী ছিলেন? ইতিহাসের আলোকে মিথটির উত্তর রাতে গানের আসর মাতিয়ে সকালে লাশের সারিতে পেহেলি ভৈরবী ভারত থেকে ২.৩ টন কাঁদুনে গ্যাস আমদানি, কঠোর নিরাপত্তায় যশোর সেনানিবাসে সাকিবের দেশে ফেরার পথ বন্ধ, হাসিনার সঙ্গে মঞ্চে ওঠায় কঠোর অবস্থানে সরকার চাঁদপুর-ঢাকা সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ, ভেঙে পড়ল খিরাই নদীর বেইলি সেতু কিশোর কুমারের ঐতিহাসিক গৌরী কুঞ্জে বিরাট কোহলির রেস্তোরাঁ, বদলে গেল কিংবদন্তির ঠিকানা

ভারতে হিন্দুত্ববাদের উত্থানের জন্য নেহরুভিয়ান এলিটরা দায়ী নয়

ভারতের সমকালীন রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই একটি যুক্তি শোনা যায়—স্বাধীনতার পর দেশের উদারপন্থী ও নেহরুভিয়ান অভিজাত শ্রেণি সাধারণ হিন্দু সমাজের অনুভূতি ও উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। সেই শূন্যতার সুযোগ নিয়েই হিন্দুত্ববাদের উত্থান ঘটেছে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এই ব্যাখ্যা আংশিক সত্য হলেও পূর্ণাঙ্গ নয়।

হিন্দুত্ববাদের বর্তমান শক্তিকে বোঝার জন্য কেবল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলেই হবে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, উপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার এবং জাতি ও ধর্ম সম্পর্কে গড়ে ওঠা কিছু গভীর ধারণা, যা স্বাধীনতার বহু আগেই সমাজে প্রোথিত হয়েছিল।

স্বাধীনতার সময় ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মূল শক্তি ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ বিশ্বাস করত যে আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে নাগরিকত্ব, ধর্মীয় পরিচয় নয়। জাতীয়তাবাদকে তখন মূলত একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রকল্প হিসেবে দেখা হতো, যেখানে ধর্মের ভূমিকা ছিল সীমিত।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চিত্র বদলাতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে উপনিবেশিক যুগের ইতিহাসচর্চা ও প্রশাসনিক চিন্তার দিকে ফিরে তাকাতে হয়। ব্রিটিশ শাসক ও চিন্তাবিদদের একটি অংশ ভারতকে দুই প্রধান সম্প্রদায়ের দেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল—হিন্দু ও মুসলমান। তাদের মতে, এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ ছিল স্থায়ী ও অনিবার্য।

এই ধারণা শুধু ইতিহাসের ব্যাখ্যা ছিল না; এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে। যখন একটি সমাজকে স্থায়ী ধর্মীয় বিভাজনের কাঠামোয় কল্পনা করা হয়, তখন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জন্যও একটি গ্রহণযোগ্য ক্ষেত্র তৈরি হয়। বিভাজনের রাজনীতি তখন ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হয়।

Romila Thapar: 'Nehruvian elite not responsible for rise of Hindutva' - The  Hindu

হিন্দুত্ববাদের আদর্শিক ভিত্তি গঠনে আরেকটি উপাদান ছিল জাতিগত ও সাংস্কৃতিক উৎস নিয়ে উপনিবেশিক যুগের নানা তত্ত্ব। আর্য পরিচয়, পিতৃভূমি, পবিত্র ভূমি—এসব ধারণা ব্যবহার করে একটি একক ও অভিন্ন সাংস্কৃতিক জাতিসত্তা নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল। যদিও আধুনিক গবেষণা বর্ণ ও জাতিকে ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে আর গ্রহণ করে না, তবু রাজনৈতিক কল্পনায় এসব ধারণার প্রভাব এখনও রয়ে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র ও হিন্দুত্ববাদের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নাগরিক অধিকার, সমতা এবং আইনের শাসন। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা প্রায়ই এই নীতিগুলোর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকের অধিকার তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না।

ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা যায়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কোনো ধর্মের বিরোধিতা করে না; বরং রাষ্ট্রকে ধর্মীয় কর্তৃত্ব থেকে স্বাধীন রাখে। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বৈধতার জন্য ধর্মীয় অনুমোদন অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে দূরত্ব কমতে থাকে এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল হয়।

আজকের ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীন ও কার্যকর অবস্থায় রয়েছে। বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক সংস্থা এবং অন্যান্য জনপরিসর যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে নাগরিকত্বের মৌলিক ধারণাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের ব্যবস্থা নয়; এটি এমন একটি কাঠামো, যা নাগরিক অধিকারকে সুরক্ষা দেয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে।

তাই হিন্দুত্ববাদের উত্থানকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ব্যর্থতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত—উপনিবেশিক ইতিহাসচর্চা, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক পরিচয়ের বিকাশ, বিভাজনের উত্তরাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের মধ্যে। এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক বাস্তবতা বোঝা ছাড়া বর্তমান ভারতীয় রাজনীতির প্রকৃত চরিত্রও সম্পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্ববাজারে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ

ভারতে হিন্দুত্ববাদের উত্থানের জন্য নেহরুভিয়ান এলিটরা দায়ী নয়

০৭:৫৬:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

ভারতের সমকালীন রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই একটি যুক্তি শোনা যায়—স্বাধীনতার পর দেশের উদারপন্থী ও নেহরুভিয়ান অভিজাত শ্রেণি সাধারণ হিন্দু সমাজের অনুভূতি ও উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। সেই শূন্যতার সুযোগ নিয়েই হিন্দুত্ববাদের উত্থান ঘটেছে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এই ব্যাখ্যা আংশিক সত্য হলেও পূর্ণাঙ্গ নয়।

হিন্দুত্ববাদের বর্তমান শক্তিকে বোঝার জন্য কেবল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলেই হবে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, উপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার এবং জাতি ও ধর্ম সম্পর্কে গড়ে ওঠা কিছু গভীর ধারণা, যা স্বাধীনতার বহু আগেই সমাজে প্রোথিত হয়েছিল।

স্বাধীনতার সময় ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মূল শক্তি ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ বিশ্বাস করত যে আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে নাগরিকত্ব, ধর্মীয় পরিচয় নয়। জাতীয়তাবাদকে তখন মূলত একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রকল্প হিসেবে দেখা হতো, যেখানে ধর্মের ভূমিকা ছিল সীমিত।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চিত্র বদলাতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে উপনিবেশিক যুগের ইতিহাসচর্চা ও প্রশাসনিক চিন্তার দিকে ফিরে তাকাতে হয়। ব্রিটিশ শাসক ও চিন্তাবিদদের একটি অংশ ভারতকে দুই প্রধান সম্প্রদায়ের দেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল—হিন্দু ও মুসলমান। তাদের মতে, এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ ছিল স্থায়ী ও অনিবার্য।

এই ধারণা শুধু ইতিহাসের ব্যাখ্যা ছিল না; এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে। যখন একটি সমাজকে স্থায়ী ধর্মীয় বিভাজনের কাঠামোয় কল্পনা করা হয়, তখন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জন্যও একটি গ্রহণযোগ্য ক্ষেত্র তৈরি হয়। বিভাজনের রাজনীতি তখন ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হয়।

Romila Thapar: 'Nehruvian elite not responsible for rise of Hindutva' - The  Hindu

হিন্দুত্ববাদের আদর্শিক ভিত্তি গঠনে আরেকটি উপাদান ছিল জাতিগত ও সাংস্কৃতিক উৎস নিয়ে উপনিবেশিক যুগের নানা তত্ত্ব। আর্য পরিচয়, পিতৃভূমি, পবিত্র ভূমি—এসব ধারণা ব্যবহার করে একটি একক ও অভিন্ন সাংস্কৃতিক জাতিসত্তা নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল। যদিও আধুনিক গবেষণা বর্ণ ও জাতিকে ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে আর গ্রহণ করে না, তবু রাজনৈতিক কল্পনায় এসব ধারণার প্রভাব এখনও রয়ে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র ও হিন্দুত্ববাদের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নাগরিক অধিকার, সমতা এবং আইনের শাসন। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা প্রায়ই এই নীতিগুলোর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকের অধিকার তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না।

ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা যায়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কোনো ধর্মের বিরোধিতা করে না; বরং রাষ্ট্রকে ধর্মীয় কর্তৃত্ব থেকে স্বাধীন রাখে। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বৈধতার জন্য ধর্মীয় অনুমোদন অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে দূরত্ব কমতে থাকে এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল হয়।

আজকের ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীন ও কার্যকর অবস্থায় রয়েছে। বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক সংস্থা এবং অন্যান্য জনপরিসর যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে নাগরিকত্বের মৌলিক ধারণাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের ব্যবস্থা নয়; এটি এমন একটি কাঠামো, যা নাগরিক অধিকারকে সুরক্ষা দেয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে।

তাই হিন্দুত্ববাদের উত্থানকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ব্যর্থতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত—উপনিবেশিক ইতিহাসচর্চা, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক পরিচয়ের বিকাশ, বিভাজনের উত্তরাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের মধ্যে। এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক বাস্তবতা বোঝা ছাড়া বর্তমান ভারতীয় রাজনীতির প্রকৃত চরিত্রও সম্পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়।