২০২৬ সালের শুরুতে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। পর্যাপ্ত শস্য ও ভোজ্যতেলের সরবরাহ খাদ্যবাজারকে সহায়তা করছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় সেই স্থিতিশীলতা নতুন করে চাপে পড়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, খাদ্যবাজারে এখন একাধিক ঝুঁকি একসঙ্গে তৈরি হচ্ছে, যা চলতি বছরে খাদ্যপণ্যের দাম প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬ সালের কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক অনুযায়ী, এ বছর বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক গড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এই পূর্বাভাসের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী ঝুঁকিই বেশি।
এল নিনোর বাড়তি হুমকি
আবহাওয়াজনিত সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো এল নিনো। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) তথ্য অনুযায়ী, এল নিনো পরিস্থিতি ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এবং উত্তর গোলার্ধের শরৎ নাগাদ এটি মাঝারি থেকে শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। সাধারণত এল নিনোর কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি খরা, অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশ, উত্তর ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় শুষ্ক আবহাওয়া দেখা যায়। এসব অঞ্চল বিশ্বে শস্য, আখ ও তেলবীজ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এল নিনো যদি প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে একাধিক কৃষি উৎপাদন অঞ্চল একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা খাদ্যদামে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
সার ও জ্বালানির খরচ বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইউরিয়া, ফসফেট এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সার সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, আর প্রাকৃতিক গ্যাস নাইট্রোজেনভিত্তিক সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল। ফলে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। যদিও সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তবুও দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমূল্যের কারণে কৃষকেরা কম সার ব্যবহার করতে পারেন অথবা কম সারনির্ভর ফসলের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে ফলন কমবে এবং খাদ্য সরবরাহ সংকুচিত হবে।

বায়োফুয়েলের চাহিদা বাড়ার প্রভাব
অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বায়োফুয়েল উৎপাদন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কিন্তু বায়োফুয়েল তৈরিতে ব্যবহৃত ভুট্টা, চিনি ও ভোজ্যতেল একই সঙ্গে খাদ্যপণ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানির বাজারের চাপ খাদ্যবাজারেও ছড়িয়ে পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হওয়ার পর মাত্র তিন মাসে বিশ্বব্যাংকের তেল ও তেলজাত পণ্যের মূল্যসূচক ১১ শতাংশ বেড়েছে। এর একটি বড় কারণ বায়োডিজেলের চাহিদা বৃদ্ধি।
ইন্দোনেশিয়া আগামী ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলক বায়োডিজেল মিশ্রণের হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করছে। থাইল্যান্ড ৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য বায়োমাসভিত্তিক ডিজেলের বাধ্যতামূলক ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংক মনে করে, জ্বালানির দাম উঁচু থাকলে ভুট্টা, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো বায়োফুয়েলের কাঁচামালের দাম আরও বাড়তে পারে।
রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি
খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়তে শুরু করলে অনেক দেশ অভ্যন্তরীণ বাজার রক্ষার জন্য রপ্তানি সীমিত বা নিষিদ্ধ করার পথ বেছে নেয়। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করে।
২০০৮ ও ২০২২ সালের খাদ্য সংকটের সময় শস্য ও ভোজ্যতেল রপ্তানিতে ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধিকে আরও তীব্র করেছিল। বিশ্বব্যাংক বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি ব্যয়, সারের মূল্য ও আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করায় নতুন করে বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের আশঙ্কা বাড়ছে। এতে খাদ্য আমদানিনির্ভর নিম্ন-আয়ের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে, ২০২৬ সালে খাদ্যদামের বৃদ্ধি আপাতত সীমিত পর্যায়ে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও ঝুঁকিগুলো স্পষ্টভাবে ঊর্ধ্বমুখী। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, শক্তিশালী এল নিনো, বায়োফুয়েলের বাড়তি চাহিদা কিংবা নতুন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা—যেকোনো একটি বা একাধিক কারণ একত্রে খাদ্যপণ্যের দামকে বর্তমান পূর্বাভাসের অনেক ওপরে নিয়ে যেতে পারে।
সংস্থাটি আরও বলছে, কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট মিলিয়ে বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে অনেক দেশ খাদ্য ও জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা, কৌশলগত মজুত এবং সরবরাহ নিরাপত্তার ওপর আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর প্রভাব আগামী বছরগুলোতেও বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে অনুভূত হতে পারে।
২০২৬ সালে এল নিনো, জ্বালানি ব্যয় ও বায়োফুয়েলের চাহিদা বৈশ্বিক খাদ্যদামে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















