ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে ভূগোল কেবল মানচিত্রের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং কূটনীতিরও ভিত্তি। এই বাস্তবতায় ভারতের গ্রেট নিকোবর দ্বীপকে ঘিরে গড়ে ওঠা বৃহৎ অবকাঠামো পরিকল্পনা শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সংযোগকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
বছরের পর বছর ভারত আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে একটি অদ্ভুত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও দেশটির অধিকাংশ সমুদ্রবন্দর অতিবৃহৎ জাহাজ গ্রহণের উপযোগী নয়। ফলে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন শ্রীলঙ্কার কলম্বো বা সিঙ্গাপুরের মতো ট্রান্সশিপমেন্ট হাবের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এতে শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ হাতছাড়া হয় না, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় ভারতের প্রভাবও সীমিত থাকে।
গ্রেট নিকোবর প্রকল্প সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থান করা এই দ্বীপ আন্তর্জাতিক পূর্ব-পশ্চিম নৌপথের খুব নিকটে। ভৌগোলিক এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আধুনিক নগর অবকাঠামো এবং শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য কেবল বাণিজ্য সম্প্রসারণ নয়; বরং ভারতকে আঞ্চলিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত করা।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে ভারতের নীতিগত ঝোঁক নতুন নয়। ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির মাধ্যমে নয়াদিল্লি বহু বছর ধরে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তব সংযোগের জন্য প্রয়োজন অবকাঠামো, যা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং মানুষের চলাচলকে সহজ করবে। গ্রেট নিকোবর সেই শূন্যস্থান পূরণের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার নিকটবর্তী অবস্থান দ্বীপটিকে একটি স্বাভাবিক আঞ্চলিক সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। এমন একটি অবস্থান থেকে ভারত শুধু পণ্য পরিবহন নয়, পর্যটন, জ্বালানি সহযোগিতা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সময়ে এই ধরনের উপস্থিতি কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
উন্নয়নের এই গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প মানেই পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ—এমন ধারণা এখন বিশ্বজুড়ে প্রচলিত। গ্রেট নিকোবরের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠেছে। দ্বীপটি জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত এবং এখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। ফলে প্রকল্পটির সাফল্য কেবল অর্থনৈতিক সূচকে নয়, পরিবেশগত ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে।
এই কারণে প্রকল্পের সমর্থকেরা যুক্তি দেন যে পরিকল্পনাটি উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে সমন্বয় তৈরির চেষ্টা করছে। বনাঞ্চলের একটি বড় অংশ সংরক্ষিত রাখার উদ্যোগ, আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে স্থানচ্যুত না করার অঙ্গীকার এবং পরিবেশগত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভূমিকম্প, সুনামি ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টিও পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অবশ্য বাস্তবায়নের পর্যায়েই এসব প্রতিশ্রুতির প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব হবে। বিশ্বের বহু উন্নয়ন প্রকল্প কাগজে পরিবেশবান্ধব হিসেবে শুরু হলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ছাড়া গ্রেট নিকোবরের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত করা কঠিন।
তবু বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির তাৎপর্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটি এমন এক সময়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যখন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্যপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে যে দেশগুলো শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারবে, ভবিষ্যতের আঞ্চলিক ভারসাম্য অনেকটাই তাদের হাতে গড়ে উঠবে।
গ্রেট নিকোবর তাই শুধু একটি দ্বীপ উন্নয়নের গল্প নয়। এটি ভারতের সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ, যার লক্ষ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে আরও গভীর সংযোগ স্থাপন, সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজের উপস্থিতিকে আরও কার্যকর করে তোলা। অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও পরিবেশ—এই তিনটি লক্ষ্যকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হলে প্রকল্পটি ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
ডি. চৌধুরী 



















