১১:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
এয়ারএশিয়ার বড় সিদ্ধান্ত: ১ জুলাই থেকে বন্ধ সিঙ্গাপুর-জাকার্তা সরাসরি ফ্লাইট, বাড়বে যাত্রার সময় স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী দিতে বহু কৌশল বিএনপির নেশার বিরুদ্ধে বড় অভিযান: ৬৮০ মিলিয়ন ডলারের মাদক আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করল মিয়ানমার পেন্টাগনের নতুন নীতি: যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণে বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা ইসরায়েল-লেবানন সমঝোতার পথে নতুন উদ্যোগ, দক্ষিণ লেবাননে ‘হিজবুল্লাহমুক্ত অঞ্চল’ নিয়ে আলোচনা ন্যাটোকে নতুন চ্যালেঞ্জে ফেলছে আর্কটিক: রাশিয়ার অগ্রযাত্রা ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির তাগিদ নিয়োগ বাণিজ্যে উপহারের বিনিময়ে সুবিধা: দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক ফার্স্ট লেডি কিমের আরও ৭ বছরের কারাদণ্ড নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপ, জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এমন পরিস্থিতি ছিল প্রায় অসম্ভব জাপানের দিকে ধেয়ে আসছে দুই ঝড়, প্রবল বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত তাইওয়ান কর্মস্থলে মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে সিঙ্গাপুর, দুই সপ্তাহের নিরাপত্তা বিরতির আহ্বান

নিয়ন্ত্রণহীন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যমই গণতন্ত্রের ভিত্তি

ডিজিটাল যুগ সংবাদপ্রবাহের চরিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। একসময় সংবাদমাধ্যম বলতে বোঝাত সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা নিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এমন অসংখ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে, যাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট নেই, কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পাদকীয় কাঠামো নেই, অথচ তারা লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ তাদের দৈনন্দিন সংবাদ চাহিদা পূরণ করছে এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।

এই পরিবর্তন প্রযুক্তিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন জড়িয়ে আছে: সংবাদমাধ্যমের পরিচয় কী? শুধু তথ্য প্রচার করলেই কি কেউ সংবাদমাধ্যম হয়ে যায়, নাকি সংবাদমাধ্যম হওয়ার জন্য আরও কিছু শর্ত প্রয়োজন?

গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি মৌলিক মূল্যবোধ। কিন্তু স্বাধীনতা কখনোই দায়িত্বহীনতার সমার্থক নয়। বরং সংবাদমাধ্যমের বিশেষ মর্যাদা এসেছে এই কারণে যে তারা তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নৈতিক এবং পেশাগত মানদণ্ড মেনে চলতে সম্মত হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি তাদের ওপর থাকে সত্যতা যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা, সংশোধনের দায়িত্ব এবং জনস্বার্থের প্রতি জবাবদিহি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বহু প্ল্যাটফর্ম নিজেদের সংবাদমাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করছে। তারা দ্রুত খবর পৌঁছে দিতে পারে, নতুন ফরম্যাট ব্যবহার করে দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারে এবং প্রচলিত গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জও জানাতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কি একইসঙ্গে সেই দায়িত্বও বহন করছে, যা একটি পেশাদার সংবাদমাধ্যমের জন্য অপরিহার্য?

একটি স্বীকৃত সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সাধারণত একটি আইনি সত্তা থাকে। সেখানে সম্পাদকীয় দায়িত্ব নির্ধারিত থাকে, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকে এবং ভুল তথ্য প্রকাশিত হলে তার সংশোধনের পথও খোলা থাকে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি জানেন কার কাছে জবাব চাইতে হবে। সংবাদমাধ্যমের আইনি সুরক্ষাও মূলত এই জবাবদিহির কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

Press freedom key to restoring democracy in Bangladesh, warn global media  watchdogs | The Business Standard

অন্যদিকে, যদি কেবল একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করলেই কেউ নিজেকে সংবাদমাধ্যম হিসেবে দাবি করতে পারে, তাহলে সেই জবাবদিহির ভিত্তি কোথায় থাকবে? ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার দায় কে নেবে? সংবাদমাধ্যমের জন্য যে পেশাগত মানদণ্ড গড়ে উঠেছে, সেগুলোর প্রয়োজনই বা তখন কী?

অনেকে মনে করেন, একটি ওয়েবসাইট থাকলেই বা অনলাইনে সংবাদ প্রকাশ করলেই সংবাদমাধ্যম হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পাওয়া যায়। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। সংবাদমাধ্যমের মর্যাদা কেবল প্রযুক্তিগত উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা, পেশাগত মানদণ্ড অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় থাকার ওপর।

কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি একটি সামাজিক চুক্তি। রাষ্ট্র এবং সমাজ সংবাদমাধ্যমকে বিশেষ সুরক্ষা দেয় এই বিশ্বাসে যে তারা দায়িত্বশীলভাবে সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করবে। সেই চুক্তির একটি অংশ যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাটিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থানকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নতুন ধরনের সংবাদ উদ্যোগও গণতান্ত্রিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তাদের জন্যও স্পষ্ট নীতিমালা, নৈতিক মানদণ্ড এবং জবাবদিহির কাঠামো প্রয়োজন। অন্যথায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে এমন এক পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং জনআস্থা ভেঙে পড়বে।

অতএব, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত না কে কত দ্রুত সংবাদ পৌঁছে দিতে পারে। মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, সেই সংবাদ প্রকাশের দায় কে বহন করবে। কারণ প্রকৃত সংবাদমাধ্যমকে আলাদা করে চেনায় তার প্রযুক্তি নয়, তার জবাবদিহি। স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব—এই দুইয়ের ভারসাম্যই গণমাধ্যমের শক্তি। এর একটিকে বাদ দিলে সংবাদমাধ্যম শক্তিশালী হয় না; বরং তথ্যব্যবস্থার ভেতর বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি বাড়ে।

জনপ্রিয় সংবাদ

এয়ারএশিয়ার বড় সিদ্ধান্ত: ১ জুলাই থেকে বন্ধ সিঙ্গাপুর-জাকার্তা সরাসরি ফ্লাইট, বাড়বে যাত্রার সময়

নিয়ন্ত্রণহীন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যমই গণতন্ত্রের ভিত্তি

১০:০০:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

ডিজিটাল যুগ সংবাদপ্রবাহের চরিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। একসময় সংবাদমাধ্যম বলতে বোঝাত সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা নিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এমন অসংখ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে, যাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট নেই, কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পাদকীয় কাঠামো নেই, অথচ তারা লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ তাদের দৈনন্দিন সংবাদ চাহিদা পূরণ করছে এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।

এই পরিবর্তন প্রযুক্তিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন জড়িয়ে আছে: সংবাদমাধ্যমের পরিচয় কী? শুধু তথ্য প্রচার করলেই কি কেউ সংবাদমাধ্যম হয়ে যায়, নাকি সংবাদমাধ্যম হওয়ার জন্য আরও কিছু শর্ত প্রয়োজন?

গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি মৌলিক মূল্যবোধ। কিন্তু স্বাধীনতা কখনোই দায়িত্বহীনতার সমার্থক নয়। বরং সংবাদমাধ্যমের বিশেষ মর্যাদা এসেছে এই কারণে যে তারা তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নৈতিক এবং পেশাগত মানদণ্ড মেনে চলতে সম্মত হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি তাদের ওপর থাকে সত্যতা যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা, সংশোধনের দায়িত্ব এবং জনস্বার্থের প্রতি জবাবদিহি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বহু প্ল্যাটফর্ম নিজেদের সংবাদমাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করছে। তারা দ্রুত খবর পৌঁছে দিতে পারে, নতুন ফরম্যাট ব্যবহার করে দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারে এবং প্রচলিত গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জও জানাতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কি একইসঙ্গে সেই দায়িত্বও বহন করছে, যা একটি পেশাদার সংবাদমাধ্যমের জন্য অপরিহার্য?

একটি স্বীকৃত সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সাধারণত একটি আইনি সত্তা থাকে। সেখানে সম্পাদকীয় দায়িত্ব নির্ধারিত থাকে, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকে এবং ভুল তথ্য প্রকাশিত হলে তার সংশোধনের পথও খোলা থাকে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি জানেন কার কাছে জবাব চাইতে হবে। সংবাদমাধ্যমের আইনি সুরক্ষাও মূলত এই জবাবদিহির কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

Press freedom key to restoring democracy in Bangladesh, warn global media  watchdogs | The Business Standard

অন্যদিকে, যদি কেবল একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করলেই কেউ নিজেকে সংবাদমাধ্যম হিসেবে দাবি করতে পারে, তাহলে সেই জবাবদিহির ভিত্তি কোথায় থাকবে? ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার দায় কে নেবে? সংবাদমাধ্যমের জন্য যে পেশাগত মানদণ্ড গড়ে উঠেছে, সেগুলোর প্রয়োজনই বা তখন কী?

অনেকে মনে করেন, একটি ওয়েবসাইট থাকলেই বা অনলাইনে সংবাদ প্রকাশ করলেই সংবাদমাধ্যম হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পাওয়া যায়। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। সংবাদমাধ্যমের মর্যাদা কেবল প্রযুক্তিগত উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা, পেশাগত মানদণ্ড অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় থাকার ওপর।

কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি একটি সামাজিক চুক্তি। রাষ্ট্র এবং সমাজ সংবাদমাধ্যমকে বিশেষ সুরক্ষা দেয় এই বিশ্বাসে যে তারা দায়িত্বশীলভাবে সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করবে। সেই চুক্তির একটি অংশ যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাটিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থানকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নতুন ধরনের সংবাদ উদ্যোগও গণতান্ত্রিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তাদের জন্যও স্পষ্ট নীতিমালা, নৈতিক মানদণ্ড এবং জবাবদিহির কাঠামো প্রয়োজন। অন্যথায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে এমন এক পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং জনআস্থা ভেঙে পড়বে।

অতএব, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত না কে কত দ্রুত সংবাদ পৌঁছে দিতে পারে। মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, সেই সংবাদ প্রকাশের দায় কে বহন করবে। কারণ প্রকৃত সংবাদমাধ্যমকে আলাদা করে চেনায় তার প্রযুক্তি নয়, তার জবাবদিহি। স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব—এই দুইয়ের ভারসাম্যই গণমাধ্যমের শক্তি। এর একটিকে বাদ দিলে সংবাদমাধ্যম শক্তিশালী হয় না; বরং তথ্যব্যবস্থার ভেতর বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি বাড়ে।