গৃহযুদ্ধের দীর্ঘ ক্ষত কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে সিরিয়া। দেশটির নতুন নেতৃত্ব বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে একের পর এক উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে পুনর্গঠনের কাজ প্রত্যাশিত গতি পায়নি। নিরাপত্তা ঝুঁকি, প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি, অর্থের সংকট এবং নীতিগত অস্পষ্টতা এখনো পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
সম্প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের এক শীর্ষ নেতার সফর এবং বিদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নতুন আশার বার্তা দিলেও রাজধানীতে বিস্ফোরণের ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, স্থিতিশীলতা ছাড়া উন্নয়নের পথ সহজ নয়।
ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন সূচনার অপেক্ষা
রাজধানী দামেস্কের উপকণ্ঠের একসময়ের ব্যস্ত জনপদ জোবার আজও ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ভাঙা ভবন, ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ ও দোকানপাট এখনো যুদ্ধের স্মৃতি বহন করছে। অনেক এলাকায় মৌলিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও পুরোপুরি সচল নয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুনর্গঠনের ধীরগতিকে ঘিরে হতাশা বাড়ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুরোনো প্রশাসনিক নিয়ম, দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতিপ্রবণ ব্যবস্থার কারণে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং বাস্তবায়নে বিলম্বও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে।

বিপুল অর্থের প্রয়োজন
সিরিয়ার সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু বাড়িঘর নির্মাণ নয়। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামোও নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভৌত অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে।
পুনর্গঠনে ২১৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০২৪ সালের দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় দশ গুণ।
বিনিয়োগই ভরসা
নতুন সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিবর্তে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কৌশল নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর আগ্রহও বেড়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বিনিয়োগকারীরা বিমানবন্দর উন্নয়ন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, আবাসন, ব্যাংকিং, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন। নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প, সাশ্রয়ী আবাসন, উচ্চগতির যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশের বাইরে থাকা সিরীয় উদ্যোক্তারাও তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় বড় প্রকল্পে অর্থায়নের উদ্যোগও চলছে।
অর্থনীতি এখনো নাজুক
বিদেশি আগ্রহ বাড়লেও দেশের আর্থিক ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে মানুষের অনীহা থাকায় ঋণ বিতরণও সীমিত। জাতীয় মুদ্রার মানও ডলারের বিপরীতে চাপের মধ্যে রয়েছে।
এছাড়া বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়। নীতিগত অস্পষ্টতা এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে অনেক বড় বিনিয়োগকারী অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
বিদেশি বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সাফল্যকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা দ্রুত পুনর্গঠন এবং জীবনযাত্রার উন্নতি। অনেকেই মনে করছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকাগুলো পুনর্নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য কমানোই সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বর্তমানে প্রতি চারজন সিরীয়ের একজন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন। তাই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ঘোষণা নয়, বরং ধ্বংসস্তূপে নতুন ঘর, সচল অবকাঠামো এবং স্বাভাবিক জীবনের প্রত্যাবর্তনই হবে সরকারের সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















