সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তনের পর ক্যাপটাগন উৎপাদন ও পাচার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মধ্যপ্রাচ্যের অবৈধ মাদক বাণিজ্য থেমে নেই। বরং আগের তুলনায় এটি আরও বিকেন্দ্রীভূত হয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল নেটওয়ার্ক ভেঙে গিয়ে এখন একাধিক দেশে নতুন উৎপাদন ও পাচারের কেন্দ্র গড়ে উঠছে।
সিরিয়ার মাদক সাম্রাজ্যে বড় ধাক্কা
দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়া ক্যাপটাগনের অন্যতম প্রধান উৎপাদক হিসেবে পরিচিত ছিল। নতুন সরকার আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জন এবং পুনর্গঠনের পথ সহজ করতে এই অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। গত এক বছরে নিরাপত্তা বাহিনী ৫০ কোটিরও বেশি ক্যাপটাগন বড়ি জব্দ করেছে এবং ১৬টি বড় কারখানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
সরকার দাবি করেছিল, দেশে আর ক্যাপটাগন উৎপাদন হয় না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আরও আট কোটির বেশি বড়ি উদ্ধার হওয়ায় স্পষ্ট হয়েছে যে পুরোনো মজুদের পাশাপাশি নতুন উৎপাদনও চলছে।
নতুন ঘাঁটি সুইদা
বর্তমানে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় সুইদা প্রদেশকে নতুন উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেখানে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে একাধিক গোপন কারখানা পরিচালিত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রদেশটিতে এক ডজনেরও বেশি কারখানা সক্রিয় রয়েছে। আগের শাসনামলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু নেটওয়ার্কও সেখানে আবার সংগঠিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
জর্ডান সীমান্তে বাড়ছে চাপ
সুইদায় উৎপাদিত ক্যাপটাগনের বড় অংশ জর্ডান হয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাচার করা হয়। মরুভূমি ঘেরা দীর্ঘ সীমান্ত এবং পুরোনো উপজাতীয় বাণিজ্যপথ পাচারকারীদের জন্য এখনো বড় সুবিধা।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিরিয়া ও জর্ডান যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। সীমান্তে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি সন্দেহভাজন উৎপাদনকেন্দ্রেও অভিযান চালানো হচ্ছে। পাচারকারীরা এখন জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত বেলুন ব্যবহার করে মাদক পাঠানোর নতুন কৌশলও গ্রহণ করেছে।

ছড়িয়ে পড়ছে উৎপাদন
ক্যাপটাগন উৎপাদন এখন শুধু সিরিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই। লেবাননেও একাধিক কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে এবং সীমান্ত এলাকায় উৎপাদন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
এছাড়া কুয়েত, মিসর, সুদান, ইয়েমেন এবং ভারতেও ক্যাপটাগন উৎপাদন বা সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, আঞ্চলিক এই মাদক ব্যবসা এখন বিস্তৃত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে।
বিপজ্জনক চাহিদা
ক্যাপটাগন মূলত এক ধরনের উত্তেজক মাদক, যা একসময় চিকিৎসায় ব্যবহার হলেও আসক্তির ঝুঁকির কারণে বহু বছর আগে নিষিদ্ধ হয়। বর্তমানে দীর্ঘ সময় কাজ করার জন্য শ্রমিক, ক্ষুধা দমনে দরিদ্র মানুষ, মানসিক চাপ সামলাতে সংঘাতকবলিত এলাকার যোদ্ধা এবং বিনোদনের উদ্দেশ্যে কিছু ধনী ভোক্তার মধ্যে এর ব্যবহার দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাদক হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তবু মধ্যপ্রাচ্যে এর চাহিদা কমেনি। বরং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবহারকারী আরও ক্ষতিকর কৃত্রিম মাদকের দিকে ঝুঁকছেন।
থামছে না অবৈধ বাণিজ্য
সিরিয়ার কঠোর অভিযানে পুরোনো কাঠামো দুর্বল হলেও পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েনি। উৎপাদন ও পাচারের কেন্দ্র এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ায় মাদকবিরোধী লড়াই আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আঞ্চলিক সমন্বয় আরও শক্তিশালী না হলে এই অবৈধ ব্যবসা নতুন রূপে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















